সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ ঘিরে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে যে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশও এখন সরাসরি জড়িয়ে পড়ার পথে হাঁটছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একাধিকবার জানানো হয়েছে, এ চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ রয়েছে এবং সরকার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে।
একই সঙ্গে সরকারের আরেকটি অংশ থেকে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতি ও জনস্বার্থের জন্য এ চুক্তি কতটা লাভজনক হবে, তা মূল্যায়ন করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ দ্বিধা থেকেই স্পষ্ট, মক্কা চুক্তিতে যোগদানের প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্য মোটেও সরল কোনো বিষয় নয়।
গত ৭ আগস্ট মক্কায় স্বাক্ষরিত এ চুক্তিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সই করেন। একে অনেকে ইসরায়েলবিরোধী নতুন সামরিক জোট হিসেবে তুলে ধরলেও, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এটি মূলত ১৯৫৫ সালের মার্কিন-প্রভাবিত বাগদাদ চুক্তি এবং পরবর্তীকালে গঠিত বিভিন্ন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোরই ধারাবাহিকতা, যার মূল লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আঞ্চলিক স্বার্থরক্ষা।
বিশ্লেষকদের যুক্তি হলো, সৌদি আরব বহু বছর ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক রেখে আসছে এবং তুরস্কও ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রেখেছে ফলে মক্কা চুক্তিকে আব্রাহাম চুক্তির প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং তার পরিপূরক হিসেবে দেখাই যুক্তিসংগত। একই সময়ে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পৃথক একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি করে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান প্রাপ্তির প্রতিশ্রুতিসহ ‘প্রধান নন-ন্যাটো মিত্র’ মর্যাদা লাভ করেছে, যা এ পর্যবেক্ষণকে আরও জোরালো করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ দুই মিত্র মিসর ও জর্ডান এখনো এই চুক্তির বাইরে রয়েছে, যা এই জোটের প্রকৃত রাজনৈতিক মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা নীতিগতভাবে বাংলাদেশের জন্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, লাখো প্রবাসী শ্রমিকের কর্মসংস্থান, হজ ব্যবস্থাপনা এবং তুরস্ক-পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এ জোটে যুক্ত হওয়ার একটি কূটনৈতিক আকর্ষণ থাকা স্বাভাবিক। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যেও এই ইতিবাচক মনোভাবের প্রতিফলন স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে ঘিরে বাড়তে থাকা কূটনৈতিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের জোটে যুক্ত হওয়াকে কেউ কেউ দেশের কূটনৈতিক অবস্থান সংহত হওয়ার একটি লক্ষণ হিসেবেও দেখতে পারেন।
কিন্তু এ আকর্ষণের বিপরীতে ঝুঁকিগুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রথমত, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের ভিত্তি সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয় এ অবস্থান থেকে সরে কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হওয়া একটি বড় নীতিগত পরিবর্তন, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব খতিয়ে না দেখে এগোনো সংগত হবে না।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে যে টানাপড়েনের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে সীমান্তে বিএসএফের আগ্রাসী তৎপরতা নিয়ে অভিযোগ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো নিয়ে অমীমাংসিত বিরোধ যার অন্যতম কারণ তার মধ্যে একটি সামরিক জোটে যুক্ত হলে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে।
তৃতীয়ত, এ জোটের প্রকৃত লক্ষ্যবস্তু কারা, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ যদি সঠিক হয় যে এটি মূলত ইরান ও তার মিত্রদের ঠেকানোর একটি আঞ্চলিক কাঠামো, তাহলে বাংলাদেশকে এমন একটি সম্ভাব্য সংঘাতের পক্ষ হয়ে যেতে হতে পারে, যার সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো প্রত্যক্ষ স্বার্থ জড়িত নেই। এই বাস্তবতায় সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয় বিবেচনা জরুরি।
চুক্তির প্রকৃত শর্তাবলি, বিশেষত সামরিক হস্তক্ষেপ বা সৈন্য মোতায়েনের সম্ভাব্য বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে সরকারকে জনসমক্ষে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব খতিয়ে দেখে একটি পূর্ণাঙ্গ ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লাভ-ক্ষতির সম্পূর্ণ পর্যালোচনা ছাড়া কোনো তাড়াহুড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা যেন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি লঙ্ঘন না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি কূটনৈতিক সুযোগ হয়ে উঠতে পারে, আবার অসতর্ক সিদ্ধান্তে তা একটি জটিল বিপদেও রূপ নিতে পারে। সরকার কতটা সতর্কতা, স্বচ্ছতা ও দূরদৃষ্টি নিয়ে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক অবস্থান।
কেকে/ এমএস