১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক পথচলায় দলটি বহু উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম, রাষ্ট্রক্ষমতা ও বিরোধী দলের রাজনীতি অতিক্রম করেছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতার বাইরে আজ সবচেয়ে জরুরি যে প্রশ্নটি সামনে আনা দরকার, তা হলো—জিয়ার রাজনৈতিক শিক্ষার কতটুকু আমরা ধারণ করছি?
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি তোষামোদ পছন্দ করতেন না। বরং তিনি সমালোচনা শুনতে চাইতেন। কারণ তাঁর কাছে সমালোচনা ছিল দুর্বলতা নয়; বরং নিজের ভুল বোঝা এবং সংশোধনের একটি কার্যকর পথ।
এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা আজও রাজনৈতিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে আছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উপস্থিতিতে এবং রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ একেএ ফিরোজ নূনের পরিচালনায় একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে দলের একজন শীর্ষ নেতা জিয়াউর রহমানকে তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটোর সঙ্গে তুলনা করে প্রশংসা করেন। কিন্তু সেই প্রশংসায় জিয়া খুশি হননি।
বরং তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে অধ্যক্ষ ফিরোজ নূনকে বলেন, “নূন সাহেব, এ ধরনের তোষামোদ ও অতিরিক্ত প্রশংসা করলে আমি আর কোনো সেমিনারে আসব না। আমার প্রশংসার জন্য এই সেমিনার নয়। যারা আমার ও আমার দলের সমালোচনা করতে পারবে, তাদের এখানে বক্তা হিসেবে ডাকবেন। তাতে আমারও উপকার হবে, দলেরও উপকার হবে। আমরা আমাদের ভুলত্রুটি সম্পর্কে জানতে পারব এবং সেগুলো সংশোধন করতে পারব।”
একজন রাষ্ট্রনায়কের মুখে এমন কথা নিছক একটি ব্যক্তিগত পছন্দের প্রকাশ নয়। এর মধ্যে ছিল একটি গভীর রাজনৈতিক উপলব্ধি। নেতার চারপাশে প্রশংসাকারী যত বাড়ে, বাস্তবতা থেকে নেতার দূরত্ব তত বাড়তে পারে। কারণ তোষামোদ সত্যকে আড়াল করে। আর সমালোচনা সত্যকে সামনে নিয়ে আসে।
একজন নেতা যদি কেবল তাঁর প্রশংসা শুনতে চান, তাহলে একসময় তিনি জনগণের প্রকৃত বক্তব্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন। মন্ত্রী-এমপির ব্যর্থতা তাঁর কাছে পৌঁছাবে না, তৃণমূলের ক্ষোভ তাঁর কাছে পৌঁছাবে না, দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা তাঁর কাছে পৌঁছাবে না। শেষ পর্যন্ত তিনি এমন একটি কৃত্রিম বাস্তবতার মধ্যে আটকে যেতে পারেন, যেখানে সবাই তাঁকে সফল বলছে—কিন্তু জনগণ হয়তো ভিন্ন কথা বলছে।
জিয়া এই বিপদটি বুঝতেন বলেই সম্ভবত সমালোচনাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। প্রশিক্ষণ ছিল শুধু বক্তৃতা নয়, রাজনৈতিক শিক্ষার জায়গা। বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনীতিতে রাজনৈতিক আদর্শ ও কর্মীদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। দলীয় নেতাকর্মীদের শুধু কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য নয়, দলের দর্শন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে রাজনৈতিক ধারণা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছিল। এই উদ্দেশ্যেই রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আর প্রশিক্ষণ মানেই যদি শুধু নেতার প্রশংসা হয়, তাহলে সেটি আর প্রশিক্ষণ থাকে না; সেটি হয়ে যায় আনুগত্যের প্রদর্শনী।
জিয়ার বক্তব্য ছিল তার বিপরীত। তিনি চেয়েছিলেন—প্রশ্ন থাকুক, সমালোচনা থাকুক, বিতর্ক থাকুক এবং ভুল ধরিয়ে দেওয়ার মানুষ থাকুক। কারণ একটি রাজনৈতিক দল তখনই পরিণত হয়, যখন তার কর্মীরা শুধু নির্দেশ পালন করে না; বরং দলের আদর্শ বোঝে, রাষ্ট্রের সমস্যা বোঝে, জনগণের কথা বোঝে এবং প্রয়োজন হলে নেতৃত্বের ভুলও ধরিয়ে দিতে পারে। আজকের বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি কোথায়?
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এই প্রশ্নটি করা অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশ্ন সবসময় আরামদায়ক হয় না। আজ বিএনপির সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শক্তি শুধু জনসমর্থন নয়—সাংগঠনিক আত্মসমালোচনার সক্ষমতা। দলের ভেতরে কি এমন পরিবেশ আছে, যেখানে একজন কর্মী তাঁর নেতার ভুলের কথা বলতে পারেন? একজন জেলা নেতা কি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তিসংগত প্রশ্ন তুলতে পারেন?
একজন এমপি বা সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধি কি শুধু আনুগত্যের কারণে নয়, নিজের যোগ্যতা ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়িত হন? কোনো নেতা ব্যর্থ হলে তাঁকে কি ব্যর্থ বলা যায়? দলের সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হলে সেটি কি সংশোধন করা হয়? নাকি ভুল সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য নতুন করে যুক্তি তৈরি করা হয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু বিএনপির জন্য নয়, বাংলাদেশের যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
তোষামোদ কখনো নেতৃত্বের বিকল্প হতে পারে না। রাজনীতিতে তোষামোদ নতুন কোনো বিষয় নয়। ক্ষমতার চারপাশে সবসময় এমন মানুষ থাকে, যারা নেতার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে প্রমাণ করতে চায়। নেতার বক্তব্যের আগে তারা হাততালি দেয়, সিদ্ধান্তের আগে সমর্থন করে এবং সিদ্ধান্তের ফলাফল খারাপ হলেও দায় অন্যের ওপর চাপায়।
এ ধরনের সংস্কৃতি সাময়িকভাবে নেতাকে স্বস্তি দিতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দলকে দুর্বল করে। কারণ চাটুকার নেতা তৈরি করে না, চাটুকার শুধু নেতার চারপাশে একটি কৃত্রিম নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে। সত্যিকারের রাজনৈতিক কর্মী কখনো কখনো নেতাকে অস্বস্তিতে ফেলবেন। প্রশ্ন করবেন। আপত্তি জানাবেন। ভুল ধরিয়ে দেবেন। কারণ তাঁর আনুগত্য ব্যক্তির প্রতি নয়—আদর্শের প্রতি। এই জায়গাটিই জিয়ার রাজনৈতিক শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে পুনরায় আলোচনায় আসা প্রয়োজন।
ব্যক্তির চেয়ে দল, দলের চেয়ে দেশ :
জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের আলোচনায় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু জাতীয়তাবাদ কেবল একটি স্লোগান নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, জনগণের অধিকার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি। তাই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করার অর্থ শুধু একটি রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করা নয়; বরং দেশের মানুষের স্বার্থকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রাখা।
এই জায়গায় এসে আবার সেই পুরোনো প্রশ্নটি সামনে আসে—আমরা কি জনগণের কথা শুনছি, নাকি শুধু নিজেদের কথা শুনছি? রাজনৈতিক দলের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় তখনই, যখন দলের অভ্যন্তরে সবাই একই কথা বলতে শুরু করে। কারণ সবাই একই কথা বলছে মানেই সবাই একমত—এটি সবসময় সত্য নয়। অনেক সময় এর অর্থ হতে পারে, ভিন্নমত প্রকাশের জায়গাটি সংকুচিত হয়ে গেছে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হোক আত্মসমালোচনারও দিন :
১ সেপ্টেম্বর তাই শুধু কেক কাটা, আলোচনা সভা, মিছিল কিংবা শুভেচ্ছা বিনিময়ের দিন হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে বিএনপির জন্য আত্মপর্যালোচনার দিন হতে পারে। প্রায় পাঁচ দশকের পথচলায় দলটি কী অর্জন করেছে, কোথায় সফল হয়েছে, কোথায় ব্যর্থ হয়েছে—তার নির্মোহ মূল্যায়ন প্রয়োজন। আর সেই মূল্যায়ন করতে হলে প্রয়োজন এমন মানুষ, যারা সত্য কথা বলবেন। নেতৃত্বকে খুশি করার জন্য নয়, নেতৃত্বকে সঠিক পথে রাখতে যারা প্রয়োজন হলে কঠিন কথাও বলবেন।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সেই শিক্ষাটি এখানেই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক—“প্রশংসা নয়, সমালোচনা শুনুন।” কারণ প্রশংসা আত্মতৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু সমালোচনা আত্মসংশোধনের সুযোগ তৈরি করে। একটি দলকে দুর্বল করে বিরোধী দল সবসময় নয়; কখনো কখনো দলের ভেতরের অন্ধ আনুগত্যও দলকে দুর্বল করে। আবার একটি দলকে শক্তিশালী করে শুধু জনসমর্থন নয়; শক্তিশালী করে নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস।
শেষ কথা :
বিএনপির সামনে আজ বড় রাজনৈতিক সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি বড় দায়িত্বও আছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়; ক্ষমতা পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও নৈতিক প্রস্তুতিও প্রয়োজন। আর সেই প্রস্তুতির প্রথম শর্ত—নিজের ভুল শোনার সাহস।
জিয়া যদি নিজের প্রশংসা শুনে সন্তুষ্ট না হয়ে সমালোচকদের তাঁর সামনে কথা বলার সুযোগ দিতে পারেন, তাহলে তাঁর অনুসারীদের কাছেও সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাশা করা অযৌক্তিক নয়। আজ বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শ্রদ্ধাঞ্জলি হতে পারে ফুল নয়, ব্যানার নয়, স্লোগানও নয়। বরং জিয়ার সেই রাজনৈতিক শিক্ষাকে নতুন করে ধারণ করা—নেতাকে খুশি করার জন্য নয়, নেতাকে সত্য জানানোর জন্য রাজনীতি। তোষামোদ নয়, সমালোচনা।
ব্যক্তিপূজা নয়, আদর্শ। অন্ধ আনুগত্য নয়, জবাবদিহি।
আর সর্বোপরি—দলের স্বার্থের ঊর্ধ্বে জনগণের স্বার্থ, আর জনগণের স্বার্থে ‘‘সবার আগে বাংলাদেশ’’। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতিই হতে পারে জিয়াউর রহমানের প্রতি সবচেয়ে অর্থবহ শ্রদ্ধা এবং বিএনপির আগামী দিনের পথচলার অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি।
কেকে/এমএ