মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৭ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: তারেক রহমানের সাথে শিগগিরই সাক্ষাতের প্রত্যাশা ট্রাম্পের      ‘বোয়িং আপনাকে হতাশ করবে না’, তারেক রহমানকে ট্রাম্পের চিঠি      বহুদলীয় গণতন্ত্রই নয়, সংসদীয় গণতন্ত্রও বিএনপির হাত ধরে এসেছে : প্রধানমন্ত্রী      হামে শিশুমৃত্যু হাজার ছুঁই ছুঁই      হামের উপসর্গে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১২৩১      জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা      বিএনপিতে উপেক্ষিত ত্যাগীরা      
দেশজুড়ে
১৪ বছরের ভাঙা সেতুই ৪৫ হাজার মানুষের ভরসা
নাইক্ষ্যংছড়ি (বান্দরবান) প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:০৬ পিএম আপডেট: ০১.০৯.২০২৬ ৭:০৯ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

পাহাড়ি জনপদ। বর্ষা এলেই পাহাড়ের বুক চিরে ছড়া দিয়ে নেমে আসে প্রবল স্রোত। সেই স্রোতের তোড়ে ২০১২ সালে ধসে ভেঙে যায় গর্জনিয়া উত্তর বড়বিল-বাইশারী দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সেতুটি। এরপর কেটে গেছে এক যুগেরও বেশি সময়। সরকার বদলেছে, নতুন নতুন সড়ক-সেতু নির্মাণ হয়েছে, উন্নয়নের নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে; কিন্তু দুই জেলার হাজারো মানুষের যোগাযোগের অন্যতম ভরসার সেতুটি আর ফিরে আসেনি।

সেতুর জায়গায় এখন দাঁড়িয়ে আছে একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো। ঝুঁকে থাকা কাঠামোটি পার হতে গিয়ে প্রতিদিন আতঙ্কে বুক কাঁপে পথচারীদের। একটু অসতর্ক হলেই নিচের খালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। অথচ ঝুঁকি জেনেও থেমে নেই মানুষের চলাচল। কারণ এই সাঁকোটিই গর্জনিয়া ও বাইশারীর প্রায় ৪৫ হাজার মানুষের নিত্যদিনের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান পথ।

সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুর পুরোনো ধ্বংসাবশেষের ওপর ভর করে কোনো রকমে তৈরি করা হয়েছে বাঁশের সাঁকো। কোথাও বাঁশ নড়বড়ে, কোথাও পাটাতন ভাঙা। একসঙ্গে কয়েকজন উঠলেই কেঁপে ওঠে পুরো সাঁকো। শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ রোগীদের পারাপারে তৈরি হয় বাড়তি ঝুঁকি।

এ পথ দিয়েই প্রতিদিন কেউ বাজারে যান, কেউ চিকিৎসার জন্য ছুটেন, কেউ কৃষিপণ্য নিয়ে আসেন। আর শতাধিক শিক্ষার্থী প্রতিদিন বই-খাতা হাতে এই ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো পেরিয়ে স্কুল-কলেজে যাতায়াত করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তারা জীবন হাতে নিয়ে চলাচল করলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সেতুটি পুনর্নির্মাণের দায়িত্ব নিয়ে ঠেলাঠেলি চলছে। দুই জেলার সীমানায় হওয়ায় সেতুটি যেন ‘কার দায়িত্বে’—এ প্রশ্নেই আটকে আছে মানুষের স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা।

শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের আতঙ্ক

সাঁকোটির সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীরা। সকাল হলেই বই-খাতা হাতে দল বেঁধে তারা সাঁকোর ওপর ওঠে। নিচে খরস্রোতা খাল। পা পিছলে গেলে ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। বর্ষায় ঝুঁকি আরও বাড়ে।

বাইশারীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে আসা শিক্ষার্থী মো. হাবিব বলেন, ‘প্রতিদিন সাঁকো পার হওয়ার সময় ভয় লাগে। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে সাঁকো পিচ্ছিল হয়ে যায়। অনেক সময় মনে হয়, আজ বুঝি পড়ে যাব।’

শিক্ষার্থী সুফিয়ান বলেন, ‘স্কুলে যেতে হলে এ সাঁকো পার হয়েই যেতে হয়। সাঁকো নড়বড়ে হওয়ায় একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী উঠতে পারে না। বৃষ্টি হলে অনেক সময় স্কুলে যাওয়াই বন্ধ হয়ে যায়।’

তাসলিমা নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বই-খাতা নিয়ে সাঁকো পার হওয়ার সময় খুব সাবধানে হাঁটতে হয়। নিচে তাকালে ভয় লাগে। আমরা চাই এখানে দ্রুত একটি ভালো ব্রিজ নির্মাণ করা হোক।’

স্থানীয়রা জানান, প্রায় দুই বছর আগে সাঁকো পার হওয়ার সময় বাইশারীর এক স্কুলছাত্র পিছলে পড়ে গুরুতর আহত হয়। ওই দুর্ঘটনায় তার একটি অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনার পরও স্থায়ী সেতু নির্মাণে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে এলাকাবাসীর মধ্যে।

রোগী পারাপারে চরম দুর্ভোগ

স্থানীয় মো. কামাল উদ্দীন বলেন, ‘রোগী নিয়ে এ সাঁকো পার হওয়ার কষ্ট ভাষায় বোঝানো যাবে না। অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা, একজন রোগীকে স্ট্রেচারে করে নেওয়াও ঠিকমতো সম্ভব হয় না। জরুরি রোগী হলে পরিবারের লোকজনকে আরও বিপদে পড়তে হয়।’

মো. রুবেল বলেন, ‘একটা ব্রিজ ১৪ বছর ধরে ভাঙা থাকবে—এটা কীভাবে সম্ভব? আমাদের জীবন নিয়ে যেন কারও কোনো চিন্তাই নেই। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছি। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তখন হয়তো সবাই ছুটে আসবে।’

মো. শফি আলম বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ভয় নিয়ে সাঁকো পার হয়। অনেক সময় বৃষ্টির কারণে সাঁকো পার হতে না পেরে তারা স্কুলেও যেতে পারে না।’

কৃষিপণ্য বাজারজাতেও বাধা

গর্জনিয়া ও বাইশারীর মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের জন্যও সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গর্জনিয়া এলাকায় উৎপাদিত শাকসবজি, তরিতরকারী ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাইশারী বাজারে আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে সাঁকোটিই অন্যতম ভরসা।

মো. ইউনুস বলেন, ‘আমরা বারবার কর্তৃপক্ষকে বলেছি, লিখিত আবেদনও করেছি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। ব্রিজ না থাকায় কৃষিপণ্য বাজারে আনতে অনেক সমস্যা হয়। অনেক সময় ঝুঁকি নিয়ে পণ্য পার করতে হয়।’

গর্জনিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. নাজমুল হক বলেন, ‘গর্জনিয়া থেকে উৎপাদিত শাকসবজি ও তরিতরকারি বাইশারী বাজারে আনতে এ পথ ব্যবহার করতে হয়। সাঁকো ভেঙে গেলে কয়েকদিন পর্যন্ত যাতায়াত বন্ধ থাকে। এতে কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।’

আব্দুস ছালাম বলেন, ‘প্রতিবারই দেখা গেছে, কেউ না কেউ এসে সাঁকো দেখে, ছবি তোলে, কথা বলে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। এভাবে আর কতদিন চলবে?’

আবু রায়হান বলেন, ‘দুই ইউনিয়নের মানুষ ভোট দেয়, কর দেয়। কিন্তু বিনিময়ে একটি নিরাপদ ব্রিজও পায় না—এটা সত্যিই দুঃখজনক।’

মো. নুরুন্নবী বলেন, ‘এখানে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দায়িত্বশীলদের আরও আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল।’

১৯৯৬ সালে নির্মাণ, ২০১২ সালে ধস

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে গর্জনিয়া উত্তর বড়বিল ও বাইশারী দক্ষিণ এলাকার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সেতুটি নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর ২০১২ সালের ভয়াবহ বন্যা ও প্রবল স্রোতে সেতুটি ধসে পড়ে। এরপর স্থানীয়রা বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন-নিবেদন করলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ীভাবে পুনর্নির্মাণ হয়নি।

স্থানীয়দের প্রশ্ন—‘দুই জেলার সীমানায় পড়েছে বলেই কি একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ১৪ বছর ধরে এভাবে পড়ে থাকবে?’

বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলম (কোম্পানি) বলেন, ‘ব্রিজটি পুনর্নির্মাণের জন্য আমি বান্দরবান জেলা পরিষদে আবেদন করেছি। কিন্তু এখনো কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি। জনগণের কষ্ট লাঘবে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করি।’

রামু উপজেলা প্রকৌশলী মো. কফিল উদ্দিন বলেন, ‘আমি ওই ব্রিজটি সরেজমিনে গিয়ে দেখেছি। অত্যন্ত নাজুক অবস্থা। তবে কোন দপ্তর ব্রিজটি নির্মাণ করেছিল, তা ঠিক আমরা জানি না। অফিসিয়ালি জটিলতার কারণে হয়তো এত বছর ধরে ব্রিজটি এই অবস্থায় পড়ে আছে। তবে ব্রিজটির বিষয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে।’

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। কিন্তু ব্রিজটি ঠিক কোন উপজেলার আওতাধীন, তা নিশ্চিত নই। যে উপজেলার অধীনে পড়বে, তাদেরই কাজটি করতে হবে।’

দায়িত্ব কার—এ প্রশ্নেই আটকে ৪৫ হাজার মানুষের ভাগ্য

দুই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সেতুটি পুনর্নির্মাণের দাবি জানানো হলেও বাস্তব উদ্যোগ নেই। কেউ বলেন এটি রামুর আওতাধীন, আবার কেউ বলেন নাইক্ষ্যংছড়ির বিষয়। এভাবে দায়িত্বের প্রশ্নে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হওয়ায় সেতুটির ভাগ্য যেন ঝুলে আছে।

কিন্তু মানুষের দুর্ভোগ থেমে নেই। প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে সাঁকো পার হচ্ছে শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, রোগীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বর্ষায় পানির স্রোত বাড়লে সেই ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি সেতুর অভাবে শুধু যোগাযোগব্যবস্থাই বিচ্ছিন্ন হয়নি; শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্য—সবকিছুর ওপরই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সবচেয়ে বড় আতঙ্ক, যে কোনো সময় সাঁকো ভেঙে ঘটে যেতে পারে প্রাণহানি।

কেকে/এআই



আরও সংবাদ   বিষয়:  বান্দরবান   ভাঙা সেতু  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close