ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার কাছিমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে সরকারি প্রণোদনা, সরকারি অনুদান, শিক্ষার্থীদের থেকে আদায় করা উপবৃত্তি ফি এবং বিদ্যালয়ের অন্যান্য আয়-ব্যয়ের হিসাবে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে গেল রমজান মাসে বিদ্যালয় বন্ধ থাকাকালে গোপনে প্রায় ৭০ হাজার টাকার নতুন ও পুরোনো বই বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
২০২৩ সালে পাওয়া ৫ লাখ টাকার প্রণোদনার অর্থের বড় অংশ ব্যয়ের হিসাব না থাকা, দুটি মেহগনি গাছ বিক্রির টাকা বিদ্যালয় ফান্ডে জমা না দেওয়া এবং গাছ রোপণের বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করার অভিযোগও রয়েছে।
এ সব অভিযোগের বিষয়ে তথ্য চেয়ে গত ৫ আগস্ট তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী আবেদন করেছেন বিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারী। একই সঙ্গে তারা ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসকের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আর্থিক নিরীক্ষার দাবি জানিয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগপত্রে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন— বিদ্যালয়ের নিম্নমান সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর শাহজাহান কবির, কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর মো. আনোয়ারুল হক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. আবুল হাসেম, নিরাপত্তাকর্মী শুকলাল রবিদাস, আয়া সোনিয়া আক্তার, নিরাপত্তাকর্মী মো. শামীম ও অফিস সহায়ক সুমন হোসেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, গত রমজান মাসে বিদ্যালয় বন্ধ থাকাকালে গোপনে বিদ্যালয়ের নতুন ও পুরোনো প্রায় ৭০ হাজার টাকার বই বিক্রি করা হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, এসব বই কীভাবে এবং কার কাছে বিক্রি করা হয়েছে, তার কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা দুদু মিয়া বলেন, ‘কয়েকটি ভ্যানগাড়ি ভরে বই বিক্রি করেছেন। আমি স্বচক্ষে দেখেছি বই নিয়ে যেতে। এভাবে সরকারি বই বিক্রি করে দেওয়া ঠিক? আমরা তদন্তপূর্বক এ ঘটনার বিচার চাই।’
বিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মী ও স্টোররুমের দায়িত্বে থাকা মো. শামীম বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক স্যার কল করে স্টোররুম খুলে দিতে বলেছিলেন। আমি নির্দেশ অনুযায়ী রুম খুলে বই নিতে সহযোগিতা করেছি মাত্র।’
৫ লাখ টাকার প্রণোদনার অর্থ নিয়ে অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন খাতে ৫ লাখ টাকা সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হয়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অর্থ থেকে শিক্ষকদের মধ্যে সমহারে এক লাখ টাকা বণ্টন করা হয়। আরও ৭৫ হাজার টাকা গরিব, মেধাবী ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেওয়া হয়েছে। তবে অবশিষ্ট ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা বিদ্যালয়ের উন্নয়ন খাতে ব্যয় করার বিধান থাকলেও ওই অর্থে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়নকাজ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষক-কর্মচারীদের একাংশ।
সিনিয়র শিক্ষক পারভিনা বেগম বলেন, ‘বরাদ্দের অর্থ কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে, এ সম্পর্কে আমরা অবগত না। অনিয়মের বিষয়টি আপনারা ভালো করে তদন্ত করে দেখুন, তাহলেই সব বেরিয়ে আসবে।’
গাছ বিক্রির টাকাও ফান্ডে জমা না দেওয়ার প্রসঙ্গে অভিযোগকারীরা জানান, তিন থেকে চার মাস আগে বিদ্যালয়ের দুটি মেহগনি গাছ ৮ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।
তাদের দাবি, গাছ বিক্রির অর্থ বিদ্যালয়ের ফান্ডে জমা দেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া চলতি বছর দুই দফায় গাছ রোপণের জন্য ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিদ্যালয়ে মাত্র ছয়টি গাছ লাগানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কর্মচারী-শিক্ষকদের মধ্যে অর্থ বণ্টনের বিষয়ে অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের ফান্ড থেকে সাতজন কর্মচারীকে বঞ্চিত করে অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে অর্থ বণ্টন করা হয়েছে। এসব অর্থ কোন খাতে এবং কী সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে, তারও হিসাব চেয়েছেন অভিযোগকারীরা।
তাদের দাবি, বিদ্যালয়ের সরকারি প্রণোদনা, অনুদান, উপবৃত্তি ফি ও অন্যান্য আয়-ব্যয়ের অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি গঠন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষক-কর্মচারীদের একাংশ। তাদের অভিযোগ, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর সঙ্গে পরামর্শ না করে প্রধান শিক্ষক নিজের ইচ্ছামতো ‘পকেট কমিটি’ করেছেন।
সহকারী শিক্ষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ও অবগত না করেই প্রধান শিক্ষক নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী কমিটি করেছেন।’
অভিযোগকারীদের দাবি, তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পাশাপাশি তারা বিদ্যালয়ের আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। কিন্তু অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কর্মকর্তা বা তদন্ত কমিটির মাধ্যমে বিদ্যালয়ের আর্থিক হিসাব পরীক্ষা করা হয়নি।
জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া আবেদনে তারা উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বক্তব্য বা জবাব দেওয়ার সুযোগও যথাযথভাবে দেওয়া হয়নি। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের পরিবর্তে নিরপেক্ষ তদন্ত কর্মকর্তা বা তদন্ত কমিটি দিয়ে বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তারা বিদ্যালয়ের ক্যাশবুক, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, রসিদ বই, লেজার, বিল-ভাউচার, সরকারি প্রণোদনা ও অনুদানের কাগজপত্র, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং ম্যানেজিং কমিটির রেজুলেশন পরীক্ষা করার অনুরোধ করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত সোমবার কাছিমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে গেলে প্রধান শিক্ষক সৈয়দ নূরনবী মোস্তাকিমকে পাওয়া যায়নি। পরে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম সবুজ বলেন, ‘অভিযোগগুলোর বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। সবকিছু প্রধান শিক্ষক স্যার জানেন।’
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সাবেক অভিভাবক সদস্য মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘স্কুলের কর্মচারীরা যে অভিযোগগুলো তুলেছেন, সবগুলোই সত্য। শিক্ষক জাতি গড়ার কারিগর। সেই শিক্ষক যদি দুর্নীতিপরায়ণ হয়, তাহলে এ জাতির কীভাবে উন্নতি হবে? আমরা এ দুর্নীতিবাজ অধ্যক্ষের বিচার দাবি জানাচ্ছি।’
স্থানীয় কামরুজ্জামান খোকন বলেন, ‘বিদ্যালয়ের স্টাফরা লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে, তাই ঘটনাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রধান শিক্ষক গত ৩১ আগস্ট অবসর গ্রহণ করেছেন। ফলে তদন্তের আগে ভাউচার, রসিদ, ক্যাশবুক, ব্যাংক লেনদেনসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি পরিবর্তন, গোপন, অপসারণ বা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে এসব নথি সংরক্ষণের পাশাপাশি দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে কাচিমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের এ্যাডহক কমিটির সভাপতি সৈয়দ ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। মাত্র এক মাস হলো আমি দায়িত্ব পেয়েছি। তবুও বিষয়টি নিয়ে আমি ইনকোয়ারি টিম গঠন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা রহমান বলেন, ‘এ ব্যাপারে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
কেকে/এআই