বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ছয় মাসে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির চাপ কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে বাড়ালো ভোজ্যতেলের দাম। সম্প্রতি বেড়েছে চিনির দামও। ফলে আয় বাড়ার প্রত্যাশার বিপরীতে খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও ইউটিলিটি ব্যয়ের বোঝা ক্রমেই ভারী হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ।
কেউ বাজারের তালিকা ছোট করছেন, কেউ কমাচ্ছেন প্রয়োজনীয় খরচ, আবার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাড়তি উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় সামলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ছে। একের পর এক মূল্য সমন্বয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কার পাশাপাশি জনজীবনে বাড়ছে অস্বস্তি ও অসন্তোষ।
ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাজারে ইতোমধ্যে খাদ্যপণ্যের বাড়তি দামে হিমশিম খাওয়া মানুষের জন্য রান্নার অন্যতম প্রধান উপকরণ তেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি বাড়িয়ে দেবে মাসিক সংসার ব্যয়। শুধু বাসাবাড়ির রান্না নয়, রেস্তোরাঁ, হোটেল, বেকারি ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের উৎপাদন খরচেও এর প্রভাব পড়বে। ফলে এক পণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো খাদ্যবাজারে।
বুধবার বিকেলে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান জানান, বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়াতে ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এত দিন বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১৯৯ টাকা। এখন নতুন দাম হয়েছে ২০৪ টাকা।
এর আগে সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানার মালিকেরা বৈঠক করেন।
বাণিজ্যসচিব আতাউর রহমান খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। এসব কারণ দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল আরও বেশি (লিটারে ১০ টাকা) দাম বাড়ানোর। তিনি বলেন, বাজারে বর্তমানে ভোজ্যতেলের কোনো সংকট নেই। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। সম্প্রতি বেড়েছে চিনির দাম। নতুন করে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোয় মূল্যস্ফীতিতে এর প্রভাব পড়বে কি না—এ বিষয়ে বাণিজ্যসচিব বলেন, ‘কিছুটা প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে।’
এর আগে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিও মানুষের ব্যয়ের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচের পাশাপাশি কৃষি, পণ্য পরিবহন ও বিভিন্ন উৎপাদন কর্মকাণ্ডের ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল কৃষি ও পরিবহন খাতে এর প্রভাব বেশি। পণ্য এক জেলা থেকে আরেক জেলায় পরিবহনের খরচ বাড়লে শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয় যোগ হয় ভোক্তার কেনাকাটার দামে।
জ্বালানি ব্যয়ের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির চাপও যুক্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ায় সাধারণ পরিবারের মাসিক ব্যয়, শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পরোক্ষ প্রভাবও গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির সময়ে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেলে যে কোনো ধরনের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। একজন মানুষের আয় একই থাকলেও খাদ্য, পরিবহন, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও চিকিৎসার ব্যয় বেড়ে গেলে তার হাতে থাকা প্রকৃত অর্থের মূল্য কমে যায়। ফলে পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে খাদ্যতালিকা সংকুচিত করা, শিক্ষা ও চিকিৎসায় ব্যয় কমানো কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ পিছিয়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেয়।
‘আয় বাড়ে না, খরচই বাড়ছে’
ভোজ্যতেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। রাজধানীর মিরপুরের একটি বাসায় বসবাসকারি বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মাস শেষে যে বেতন পাই, তাতে আগে থেকেই সংসার চালানো কঠিন। বাজারে একের পর এক পণ্যের দাম বাড়ছে। এখন তেলের দামও বাড়ল। গ্যাস-বিদ্যুতের বিলও বেশি দিতে হচ্ছে। আয় না বাড়লেও যদি প্রতিমাসে খরচ বাড়তে থাকে, তাহলে সংসার চালাব কীভাবে?’
একই ধরনের ক্ষোভ মানিকনগর এলাকার মুদি দোকানি রফিকের। তিনি বলেন, ‘দাম বাড়লে আমরা নিজেরা খুশি হই না। পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে কিনতে হয়, তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। কিন্তু ক্রেতারা আমাদের ওপরই ক্ষুব্ধ হন। আগে যে পরিবার মাসে কয়েকবার তেল কিনত, এখন হিসাব করে কিনছে। অনেকেই কম পরিমাণে পণ্য নিচ্ছেন।’
রাজধানীর মান্ডা এলাকার একজন রিকশাচালক খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘বাজারে একের পর এক পণ্যের দাম বাড়ছে, সংসার খরচ বাড়ছে কিন্তু যাত্রী তো ভাড়া বাড়াতে চায় না। দিন শেষে আয় একই থাকে, খরচ বাড়ে। আমাদের মতো মানুষের জন্য প্রতিদিনের জীবন আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় বাড়ার প্রভাব সরাসরি তাদের ব্যবসায় পড়ছে। রাজধানীর রামপুরা এলাকার একটি ছোট খাবারের দোকানের মালিক সফিকুল আলম বলেন, ‘রান্নার তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, কাঁচামাল সবকিছুর খরচ বাড়ছে। একদিকে খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে ক্রেতারা বেশি দাম দিতে চাইছেন না। ফলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম নির্ধারণ
সেপ্টেম্বর মাসের জন্য তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ১২ কেজি সিলিন্ডারে ১৩ টাকা কমিয়ে গতকাল নতুন দাম ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা দাম ১ হাজার ৫৯৮ টাকা থেকে কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন মূল্য তালিকায় অন্যান্য ওজনের সিলিন্ডারের দামও নির্ধারণ করেছে কমিশন।
এর মধ্যে সাড়ে ৫ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৭২৭ টাকা, সাড়ে ১২ কেজির ১ হাজার ৬৫২ টাকা এবং ১৫ কেজির ১ হাজার ৯৮২ টাকা করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১৬ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ১১৪ টাকা, ১৮ কেজি ২ হাজার ৩৭৮ টাকা, ২০ কেজি ২ হাজার ৬৪২ টাকা, ২২ কেজি ২ হাজার ৯০৭ টাকা এবং ২৫ কেজি ৩ হাজার ৩০৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ৩০ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৩ হাজার ৯৬৪ টাকা, ৩৩ কেজির ৪ হাজার ৩৬০ টাকা, ৩৫ কেজির ৪ হাজার ৬২৪ টাকা এবং ৪৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৫ হাজার ৯৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এক সিদ্ধান্তের প্রভাব বহু খাতে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি বা ভোজ্য তেলের দামকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এসব পণ্যের দাম বাড়লে এর প্রভাব সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে পড়ে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে পাইকারি ও খুচরা বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়। একইভাবে ভোজ্যতেলের দাম বাড়লে রেস্তোরাঁ ও খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের অংশ ভোক্তার ওপর বর্তায়।
এ কারণে সরকারের কোনো মূল্য সমন্বয় সাধারণ মানুষের কাছে কেবল একটি পণ্যের দাম বৃদ্ধির ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অন্যান্য পণ্য ও সেবার সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও তীব্র হয়, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয়।
আয় বাড়ার আগেই ব্যয়ের চাপ
এদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনস্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। বেতন বাড়লে সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেতন বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে একইসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু আয় বাড়ানো নয়, মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখাই বড় বিষয়। একই সময়ে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, খাদ্য ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে থাকলে বেতন বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল সীমিত হয়ে যেতে পারে।
মধ্যবিত্তের সংকট আরও গভীর
মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে মধ্যবিত্তের ওপরও। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য যেমন সামাজিক নিরাপত্তা বা বিভিন্ন সহায়তার সুযোগ থাকে, উচ্চআয়ের মানুষের তুলনামূলকভাবে ব্যয় সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও বেশি। কিন্তু সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে একইসঙ্গে বাসাভাড়া, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত, খাদ্য ও ইউটিলিটি বিল সামলাতে হচ্ছে।
একটি পরিবারের মাসিক আয় অপরিবর্তিত থাকলেও যদি রান্নার তেল, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে, তাহলে সঞ্চয়ের সুযোগ কমে যায়। অনেক পরিবারকে জরুরি খরচের জন্য সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে কিংবা ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এ পরিস্থিতি পারিবারিক আর্থিক নিরাপত্তাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো পণ্যের যৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়াতে না পারেন, সেজন্য বাজার তদারকি জোরদার করা জরুরি। কারণ আন্তর্জাতিক বাজার বা উৎপাদন ব্যয়ের কারণে কোনো পণ্যের দাম বাড়লেও খুচরা পর্যায়ে তার চেয়ে বেশি দাম নেওয়ার প্রবণতা দেখা গেলে ভোক্তার ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়।
বিশেষ করে ভোজ্যতেল, চাল, ডাল, চিনি, আটা, ময়দা, সবজি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যয়, শুল্ক, পরিবহন ব্যয় এবং খুচরা বাজারের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় নজরদারি বাড়ানোর দাবি রয়েছে।
রাজস্ব বাড়ানো ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের তাগিদ
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের সামনে একইসঙ্গে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা, অন্যদিকে সরকারের বাড়তি ব্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব সংগ্রহ করা। সরকারি বেতন, ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন ব্যয় সামলাতে হলে রাজস্ব আয় বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু সেই রাজস্ব বাড়ানোর পদ্ধতি এমন হতে হবে যাতে সাধারণ ভোক্তার ওপর অতিরিক্ত করের চাপ না পড়ে।
তাদের মতে, করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি বন্ধ করা, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো এবং অপচয় কমানোর দিকে জোর দেওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।
কেকে/ এমএস