বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি বদলের বার্তা দিচ্ছে ভারত। ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বদলে এখন জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক বাড়ানো এবং দুই দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগাযোগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে দিল্লি। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের সংসদ সদস্যদের নিয়ে ‘ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে ভারতীয় সংসদ সফরের আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে এ পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে অতীতের কোনো পর্যায়ে আটকে না রেখে সামনে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বার্থকে দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রে রাখার বার্তা দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে ঢাকারও আপত্তি নেই। তবে কোনো শর্ত, চাপ বা একতরফা প্রত্যাশার ভিত্তিতে নয়; স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই সম্পর্ক চায় বাংলাদেশ। পানি বণ্টন, সীমান্তে হত্যা, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং বাংলাদেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগের মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানেও ভারতের ইতিবাচক ভূমিকা প্রত্যাশা করছে ঢাকা।
বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, গণতন্ত্রে আলোচনার কোনো শেষ নেই। দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলতেই থাকবে।
গঙ্গা ও পদ্মার প্রবাহের সঙ্গে আলোচনার ধারাবাহিকতার তুলনা করে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আলোচনা থেমে থাকার সুযোগ নেই। দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে উভয়পক্ষের উদ্দেশ্য জনকল্যাণমুখী বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, এটি প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও জনবান্ধব ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে সফরের বিষয়টি তার ওপর ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেন।
এর আগের দিন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। সেখানে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও বাড়াতে চায় তার দেশ।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আমরা সবসময় চাই।’ দুই দেশের সিদ্ধান্তের প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের যেন ভালো হয়, সেজন্য দুই দেশেরই দায়িত্ব রয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে নির্বাচিত সরকারই ভালো বোঝে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একইসঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়েও দুই দেশ কাজ করছে বলে জানান ত্রিবেদী।
সংসদীয় সম্পর্কেও নতুন উদ্যোগ :
ভারতের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম প্রকাশ ঘটেছে সংসদীয় যোগাযোগ বাড়ানোর প্রস্তাবে। দীনেশ ত্রিবেদী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি ‘ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
তার বক্তব্য, দলীয় বিভাজনের বাইরে গিয়ে দুই দেশের সংসদ সদস্যরা এই কাঠামোর মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করতে পারেন। সংসদ যেহেতু জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে, তাই সংসদীয় যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্কও আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। স্পিকার এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন বলেও জানান ভারতীয় হাইকমিশনার।
এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার আমন্ত্রণ। বাংলাদেশের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে ভারতীয় সংসদ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি। বুধবার সকালে ওম বিড়লার সঙ্গে তার কথা হয়েছে জানিয়ে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশের স্পিকারকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ভারতের লোকসভার স্পিকার।
বৈঠকে সংসদের কার্যক্রম ডিজিটাল করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। ভারতের সংসদের পুরোনো নথি, অধিবেশন ও বিভিন্ন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন দীনেশ ত্রিবেদী।
তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ভারতকে উপেক্ষা করবে না, ভারতও বাংলাদেশকে উপেক্ষা করে না। তবে সম্পর্ক হতে হবে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মর্যাদা, সম্মান এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সময় মিলিয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে যখন উপযুক্ত সময় হবে, তখনই সফর হবে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাংলাদেশকে ভারত সফরে যেতে হবে—এমন কোনো শর্ত মেনে নেওয়ার বিষয়েও আপত্তি জানান তিনি।
তার ভাষায়, ‘কেউ যদি ঠিক করে দেয় যে এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আসতে হবে, নতুবা নয়, কিন্তু নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে আমার সময় না থাকলে আমি যাব কী করে? সেটাতে কেউ সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। এটা স্বাধীন দেশ।’
চিফ হুইপ আরও বলেন, ‘আমাদের বন্ধুদের তরফে যদি কোনো শর্ত আরোপ করা হয়, সেটা আমাদের ভালোভাবে নেওয়াটা একটু কষ্টের ব্যাপার হয়ে যায়।’ তার বক্তব্যে স্পষ্ট, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ঢাকার আপত্তি নেই; কিন্তু সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে সমতা ও পারস্পরিক সম্মান।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের সবচেয়ে পুরোনো অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মধ্যে পানি বণ্টন অন্যতম। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বিষয়টিকে ‘বড় সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ভাটির দেশ হিসেবে উজানের পানি নিয়ে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সমস্যায় রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পানির অভাবে বাংলাদেশকে পানি সংরক্ষণের জন্য বড় প্রকল্প নিতে হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে ভারত এগিয়ে আসবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া এবং বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি নিহত হওয়ার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, দুই দেশ একে অন্যকে বন্ধু বললেও সীমান্তে বাংলাদেশি নিহত হলে বাংলাদেশের মানুষ কষ্ট পায়। সীমান্তের বিষয়গুলো ভারত মানবিকভাবে বিবেচনা করলে দুই দেশের অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নূরুল ইসলাম মনি। তার অভিযোগ, ওই সময়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভারত তা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেনি। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ অসন্তোষও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
একই সঙ্গে ভারতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি অবস্থান করছেন উল্লেখ করে তাদের বিষয়ে ঢাকার উদ্বেগের কথাও জানান চিফ হুইপ। মানবতাবিরোধী অপরাধ বা নিপীড়ন-নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের ভারত আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেবে না—এমন প্রত্যাশার কথাও বলেন তিনি।
নতুন সমীকরণের সামনে ঢাকা-দিল্লি :
ঢাকা ও দিল্লির সাম্প্রতিক কথাবার্তায় তাই দুই ধরনের বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভারত বলছে, সম্পর্ককে জনগণকেন্দ্রিক করতে হবে, সংসদীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে এবং অতীতের জায়গায় আটকে না থেকে সামনে এগোতে হবে। বাংলাদেশও সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে; তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এই নতুন সমীকরণের প্রথম বড় পরীক্ষা হতে পারে। সফর হলে সেখানে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকতা নয়, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ও পারস্পরিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো কতটা গুরুত্ব পায়, সেদিকেই নজর থাকবে।
ভারতের জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্কের নতুন বার্তা বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়, আর বাংলাদেশ যে মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক চায় দিল্লি সেটি কতটা গ্রহণ করে—তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায়।
কেকে/ এমএস