ফুলে সাজানো ঘোড়ার গাড়ি। চারপাশে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর ভিড়। কারও চোখে আনন্দ, আবার কারও চোখে বিদায়ের আবেগ। দীর্ঘ ১৭ বছরের শিক্ষকতা জীবন শেষে অবসরে যাওয়া প্রিয় প্রধান শিক্ষককে ব্যতিক্রমী আয়োজনে ঘোড়ার গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছেন সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার ৩৭ নম্বর জ্ঞানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুর হায়দার রায়হানকে বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দেওয়া হয়েছে এমনই ব্যতিক্রমী বিদায় সংবর্ধনা।
বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা, সম্মাননা স্মারক ও আলোকবর্তিকা দিয়ে সম্মান জানানো হয়। পরে ফুলে সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে করে বিদ্যালয় থেকে নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয় তাকে। ব্যতিক্রমী এই আয়োজন মুহূর্তেই পরিণত হয় এক আবেগঘন ‘রাজকীয় বিদায়ে’।
বিদায় অনুষ্ঠানে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আহসান উদ্দিন নাছিরের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ফ. খ. ম. সাজ্জাদুল মানিক। বিশেষ অতিথি ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আবু ইউসুফ, বাজিতপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত ইসলামী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার আমিরুজ্জামান আরিফ ও উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক শ্যামল গোস্বামী ও আশরাফুল ইসলাম।

জানা যায়, ২০০৯ সালে জ্ঞানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন নুর হায়দার রায়হান। দীর্ঘ কর্মজীবনে নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতেও গুরুত্ব দিয়েছেন। শিক্ষার্থীবান্ধব আচরণ ও আন্তরিকতার কারণে তিনি অল্প সময়েই শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং এলাকাবাসীর কাছে প্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন হয়ে ওঠেন। ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ৩৭ নম্বর জ্ঞানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ১৮৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী আদিয়া রহমান বলেন, “স্যার আমাদের খুব ভালোবাসতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়ার জন্য সবসময় উৎসাহ দিতেন। তার কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছি। তিনি অবসরে গেলেও আমাদের মনে তার জায়গা সবসময় থাকবে।”
প্রাক্তন শিক্ষার্থী আমিরুজ্জামান শরীফ বলেন, “নুর স্যারের কাছ থেকে শুধু বইয়ের শিক্ষা নয়, জীবনে চলার অনেক শিক্ষা পেয়েছি। তিনি শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো দেখতেন। ঘোড়ার গাড়িতে তাঁকে বিদায় দেওয়ার আয়োজন তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ।”
বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মেরিনা ইয়াসমিন বলেন, “নুর স্যার শুধু আমাদের সহকর্মী ছিলেন না, তিনি ছিলেন অভিভাবকের মতো। তার কাছ থেকে দায়িত্ববোধ, আন্তরিকতা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি ভালোবাসার শিক্ষা পেয়েছি। তার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার স্মৃতি আমাদের সবসময় মনে থাকবে।”
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আহসান উদ্দিন নাছির বলেন, “নুর হায়দার রায়হানের ১৭ বছরের কর্মজীবন আমাদের বিদ্যালয়ের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার নিষ্ঠা, সততা ও দায়িত্বশীলতা সবার জন্য অনুকরণীয়। ঘোড়ার গাড়িতে বিদায় জানানোর আয়োজনটি তার প্রতি শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর গভীর ভালোবাসার প্রতীক।”
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “একজন শিক্ষক তার কর্মজীবনে কতটা মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে পারেন, নুর হায়দার রায়হানের বিদায় অনুষ্ঠান তারই প্রমাণ। সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা যেভাবে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে বিদায় জানিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। তার অভিজ্ঞতা ও অবদান বিদ্যালয়ের স্মৃতিতে অমলিন থাকবে।”
প্রধান অতিথি ফ. খ. ম. সাজ্জাদুল মানিক বলেন, “নুর হায়দার রায়হান দীর্ঘদিন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি শুধু পাঠদানই করেননি, শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর অবসরজীবন সুন্দর, শান্তিময় ও আনন্দময় হোক—এটাই কামনা করি।”
আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অবসর গ্রহণ করবেন নুর হায়দার রায়হান। তবে অবসরের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার সম্পর্কের ইতি ঘটছে না। শিক্ষক হিসেবে তার দেওয়া শিক্ষা, ভালোবাসা ও স্মৃতি শিক্ষার্থীদের মাঝে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে।
কেকে/সাশ