শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: র‌্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের বিল সংসদে      রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করলো মিয়ানমার      বেনজীরের অবস্থান জানতে ইন্টারপোলে ফের চিঠি      আসিফ মাহমুদের দেয়া সব নিয়োগ-পদোন্নতির নথি তলব দুদকের      আগস্টে মব সহিংসতায় নিহত ২৮, নদী-খাল-জঙ্গলে হত্যাকাণ্ডের শিকার ৮৭      সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ, উদ্ধার ১৩ হাজার ৬৭৯       ডেঙ্গুতে আরও চার মৃত্যু, নতুন রোগী ১২৫২      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
গাজার যুদ্ধ : ধর্ম নাকি ভূ-রাজনীতি?
শাহ মো. জিয়াউদ্দিন
প্রকাশ: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৫৫ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মুসলমান মনে করেন, গাজার রক্তক্ষয়ী সংঘাতটি ইহুদি ও মুসলমানদের মধ্যকার ধর্মীয় যুদ্ধ। কিন্তু বাস্তবতা এর চেয়ে জটিল। গাজা আজ বিশ্ব রাজনীতির একটি ‘মধু কূপ’, যাকে কেন্দ্র করে চলছে বৈশ্বিক শক্তিসংগ্রাম। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে প্রায় ১,২০০ মানুষ হত্যা ও ২৫১ জনকে অপহরণ করে। এর জবাবে ইসরায়েল শুরু করে ‘ভয়ংকর প্রতিশোধ’—যেখানে এখন পর্যন্ত ৭৩,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যার অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। 

এ সংঘাত অন্যান্য যুদ্ধ থেকে ভিন্ন কারণ এটি এমন সময়ে ঘটছে যখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ফল্ট লাইনে চিড় ধরেছে। গত দুই দশক ধরে একদিকে ইরান ও তার মিত্ররা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার অনুগামী রাষ্ট্রগুলো। গাজা এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক রাজনীতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। ভৌগোলিক অবস্থান, ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের সংঘাত গাজাকে একটি চিরস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক দাবার ছকে পরিণত করেছে। 

গাজার সংকটের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য তথা সমগ্র বৈশ্বিক রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আসা কঠিন। গাজার ভৌগোলিক গুরুত্ব অপরিসীম। ৩৬৫ বর্গ কিলোমিটারের এ সংকীর্ণ ভূখণ্ড এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত, যা এটি তিন মহাদেশের সংযোগ স্থলে রাখে। উত্তর ও পূর্বে ইসরায়েল, দক্ষিণে মিসরের সিনাই মরুভূমি। এ অবস্থান গাজাকে চিরস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক দাবার ছকে পরিণত করেছে। 

গাজার উপকূল ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এখানে সামুদ্রিক বাণিজ্য ও বন্দরের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। ভূমধ্যসাগরের এ উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণী পাওয়া যায়, যা স্থানীয় জেলেদের জীবিকা ও খাদ্যের জোগান দেয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে মার্কিন মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়, কিন্তু এটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। 

২০২৬ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘বোর্ড অফ পিস’ নামে ১৫-দফা শান্তি পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়, যেখানে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজার শাসনভার টেকনোক্র্যাট কমিটির হাতে হস্তান্তরের কথা বলা হয়। কিন্তু হামাস শর্ত দেয় যে, ইসরায়েলি সৈন্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহার ও গাজা পুনর্গঠন নিশ্চিত না হলে তারা অস্ত্র ছাড়বে না। 

অন্যদিকে, নেতানিয়াহু সরকার পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ ছাড়া সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানায়। যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরায়েল গাজায় বিভাজনকারী দেওয়াল, বালির প্রাচীর ও গেট নির্মাণ করে ভূখণ্ডটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করছে। গাজাকে কেন্দ্র করে ইরান, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি ও সিরিয়ার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে ‘অক্ষ’ ফ্রন্ট—যা ইসরায়েল ও মার্কিনবিরোধী শিবির নামে পরিচিত। 

অন্যদিকে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিকীকরণ বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তবে গাজা সংকটের কারণে অঞ্চলটিতে জনঅসন্তোষ ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, যার প্রেক্ষিতে সৌদি আরব নিজেদের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ নামে একটি ত্রিপক্ষীয় সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেখানে বলা হয়—তিন দেশের কোনো একটিতে আক্রমণ মানে তিনটিতে আক্রমণ। এটি মূলত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি, শুধু গাজা সংকটের প্রতিক্রিয়ায় নয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে বিলিয়ন ডলারের সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তার আধিপত্য ধরে রাখতে চায়। গাজার যুদ্ধ তাদের জন্য একটি কৌশলগত দাবার চাল। 

অন্যদিকে, চীন ও রাশিয়া ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মার্কিন একচেটিয়া প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে।

পশ্চিমা দেশগুলোর নির্লিপ্ততা বৈশ্বিক রাজনীতিতে আইনের শাসন ও মানবাধিকারের দ্বিমুখী নীতিকে স্পষ্ট করেছে। এ সংঘাতের পেছনে আরেকটি অদৃশ্য চালিকাশক্তি হলো সামুদ্রিক গ্যাস সম্পদ। ভূমধ্যসাগরে গাজা উপকূল থেকে প্রায় ৩৬ কিলোমিটার পশ্চিমে ‘গাজা মেরিন’ নামক বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র রয়েছে, যাতে আনুমানিক ১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত আছে। ২০০০ সালে আবিষ্কৃত এই ক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন এখনো সম্ভব হয়নি রাজনৈতিক জটিলতা ও ইসরায়েলি অবরোধের কারণে।

জাতিসংঘের ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সংস্থার ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরো ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে (পশ্চিম তীর ও গাজা) প্রায় ১.৭ বিলিয়ন ব্যারেল উত্তোলনযোগ্য তেলের মজুত থাকতে পারে। গাজার গ্যাস ক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত সম্পদ গাজা ও পশ্চিম তীরের জ্বালানি চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব, যা ফিলিস্তিনের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি মিসর ও জর্ডানকে বেশি ফিলিস্তিনি গ্রহণের কথা বলেছিল, কিন্তু এটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব নয় এবং মিসর-জর্ডান উভয়ই দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে, এটি তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। 

গাজার যুদ্ধ সম্পূর্ণভাবে বিশ্ব রাজনীতি দখলের একটি ক্ষেত্র। ধনী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে এ সংঘাতকে ব্যবহার করছে। তাই বিভিন্ন দেশের কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী গাজার যুদ্ধকে ‘ইহুদি-মুসলিম যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে, যা বাস্তবতার সরলীকরণ মাত্র।

গাজার সংকটের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য তথা সমগ্র বৈশ্বিক রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আসা কঠিন।

লেখক : কলামিস্ট

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close