মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ছড়া-নদী থেকে অবৈধভাবে রাতের আঁধারে চলছে অবাধে বালু উত্তোলন। ভোর না হতেই সেই বালু বোঝাই করে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে ছুটছে একের পর এক ট্রাক। গতি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আর সেই বেপরোয়া গতির চাকার নিচে পিষ্ট হচ্ছে মানুষ, ভেঙে পড়ছে পরিবার। বছরের পর বছর ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও অবৈধ বালু উত্তোলনের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ভোরে ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের শ্রীমঙ্গল সুরমাভ্যালি এলাকায় বালুবাহী ড্রাম ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারান ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালক আব্দুল মান্নান (৪৫)। ঢাকা মেট্রো-ট-২৪৬৮৯৭ নম্বরের ড্রাম ট্রাকের ভয়াবহ ধাক্কায় তার ইজিবাইকটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার একটি পা, গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অপর পা। রক্তে ভেসে যায় মহাসড়ক। আহত মান্নানকে উদ্ধার করে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এক নিমিষেই নিভে যায় চার সন্তানের বাবা আব্দুল মান্নানের জীবন। তার মৃত্যুতে স্ত্রী হয়েছেন বিধবা, তিন কন্যা ও এক পুত্র হারিয়েছে তাদের বাবাকে। একটি বেপরোয়া ট্রাকের চাকা শুধু একজন মানুষকে নয়, তছনছ করে দিয়েছে একটি পরিবারকে।
এটি শ্রীমঙ্গলের সড়কে বালুবাহী ট্রাকের কারণে প্রাণহানির বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে একই ধরনের দুর্ঘটনায় একাধিক মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
২০২৪ সালের ১ জুলাই ভুনবীর ইউনিয়নের পাত্রীকুল এলাকায় শ্রীমঙ্গল-মির্জাপুর সড়কে বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হন ৪৫ বছর বয়সী এক নারী ও সাত বছর বয়সী এক কন্যাশিশু। ২০২৩ সালের ১৪ মার্চ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শাহজীবাজার এলাকায় বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারান হবিগঞ্জ রোডস্থ কাদির ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী আব্দুল কাদির (৬৫)।
২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কে বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন নেদারল্যান্ডসের নারী পর্যটক তোসকা মারিয়ান। ২০২৫ সালের ১ জুন সাতগাঁও এলাকায় বেপরোয়া বালুবাহী ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান সবজিবাহী পিকআপের যাত্রী ঝুনু বৈদ্য। ২০২৬ সালের ১ জুন ভুনবীর চৌমুহনায় বালুবাহী ট্রাক, সিএনজি ও ইজিবাইকের ত্রিমুখী সংঘর্ষে শিপন ও রাসেলসহ ছয়জন গুরুতর আহত হন।
একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। পরিবার হারাচ্ছে স্বজন। অথচ বালুবাহী ট্রাকের বেপরোয়া চলাচল থামছে না।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকায় রাত ও ভোরে বালুবাহী ট্রাকের চলাচল বেড়ে যায়। আশিদ্রোন, ভুনবীর, সাতগাঁও ও সিন্দুরখানসহ বিভিন্ন রুটে দ্রুতগতিতে ছুটে চলে এসব ট্রাক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ট্রাকের অনেকগুলো অতিরিক্ত বালু বোঝাই করে চলাচল করে। রাতের অন্ধকারে কিংবা ভোরে দ্রুতগতিতে চলার কারণে সাধারণ যানবাহন ও পথচারীদের জন্য তৈরি হচ্ছে চরম ঝুঁকি।
তাদের দাবি, শুধু দুর্ঘটনার পর ট্রাক জব্দ বা চালক আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের উৎস বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বালু পরিবহনের নামে সড়কে বেপরোয়া যান চলাচলের বিরুদ্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রভাব শুধু সড়ক দুর্ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। ইজারাবহির্ভূত স্থান থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে ছড়া ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, তীর ও আশপাশের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অন্যদিকে বৈধভাবে ইজারা দেওয়া উৎসের বাইরে বালু উত্তোলন হলে সরকারও হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। ফলে একই অবৈধ কর্মকাণ্ডে একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ, অন্যদিকে রাজস্ব হারাচ্ছে রাষ্ট্র; আর বালুবাহী ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলে ঝুঁকির মুখে পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে বারবার অভিযোগ জানিয়েও অবৈধ বালু উত্তোলন ও বালুবাহী ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলে স্থায়ী পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
তবে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, জরিমানা ও মামলা করা হচ্ছে। সড়কে দ্রুতগতির বালুবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণেও অভিযান চলছে।
সাতগাঁও হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মামুন রহমান জানান, সর্বশেষ দুর্ঘটনায় ঘাতক ড্রাম ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে এবং দুজনকে আটক করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল থানা, হাইওয়ে থানা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। বালু উত্তোলন বন্ধ এবং বালুবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কেবল ট্রাক আটক কিংবা চালককে আইনের আওতায় আনলে অবৈধ বালুর মূল কারবার বন্ধ হবে না। বালু উত্তোলনের উৎস, পরিবহন ও এর পেছনের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কেকে/এআই