শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২১ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: দুর্নীতিবাজের অস্তিত্ব বাংলাদেশে বরদাস্ত করব না : ডা. শফিকুর রহমান      নতুন স্বৈরাচার হওয়ার পথ বন্ধ করতেই লংমার্চ : নাহিদ ইসলাম      ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ শুরু      বৃষ্টির সম্ভাবনায় কাটবে শনিবার      শাপলা চত্বরে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের উদ্বোধন      তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দিল্লির কাছে ‘নতুন তথ্য নেই’      ডেঙ্গু নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি ৫১২ জন      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
দেবিদ্বারে বিএনপির রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ
মো. আজমির হোসেন
প্রকাশ: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১৯ এএম আপডেট: ০৫.০৯.২০২৬ ১১:২১ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

কুমিল্লা-৪ দেবিদ্বার। একসময় বিএনপির একক শক্ত ঘাঁটি ও ধানের শীষের আসন হিসেবে পরিচিত এই উপজেলার রাজনীতি এখন অনেকটাই বদলে গেছে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, এরপর আবার জাতীয় রাজনীতির নতুন হিসাব-নিকাশ। কিন্তু সেই হিসাবের খাতা খুললে বিএনপির জন্য স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তির জায়গাই বেশি চোখে পড়ে। সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল নয়, বরং বিএনপির নিজেদের দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দূরত্ব।

দেবিদ্বারের মাঠে জাতীয় নাগরিক পার্টির হাসনাত আব্দুল্লাহ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নাম। হাসনাতের নেতৃত্বে এনসিপি ও জামায়াতসহ ১১ দলের সমন্বিত তৎপরতায় সভা, সমাবেশ, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটি গঠনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। জামায়াতের সাইফুল ইসলাম শহীদসহ ১১ দলের স্থানীয় নেতারাও এই রাজনৈতিক তৎপরতায় সক্রিয়ভাবে এনসিপিকে সহযোগিতা করছেন। ফলে এনসিপি ও জামায়াত জোটের দেবিদ্বারের রাজনীতির মাঠে একটি সমন্বিত রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠছে।

বিএনপির চিত্রটি ঠিক উল্টো। দলটির দীর্ঘদিনের পরিচিত নেতাদের মধ্যে সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, সাবেক জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এএফএম তারেক মুন্সী, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও বেলজিয়াম বিএনপির সভাপতি সাইদুর রহমান লিটন, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য এম এ আউয়াল খান, উত্তর জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক ব্যারিস্টার রেজবিউল আহসান মুন্সী ও মহিলা দলের সুফিয়া খাতুনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাম রয়েছে। কিন্তু নেতৃত্বের এই প্রাচুর্য রাজনীতির মাঠে সমঝোতায় আসছে না, ঐক্যে পরিণত হচ্ছে না; বরং স্থানীয় রাজনীতিতে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, তারেক মুন্সী, সাইদুর রহমান লিটন ও আবদুল আউয়াল ভূঁইয়াকে ঘিরে আলাদা বলয়ের আলোচনা রয়েছে। ফলে একই দলের কর্মীরা অনেক সময় কেন্দ্রীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি আলাদাভাবে পালন করছেন। এটাই বিএনপির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

অতীতের দেবিদ্বার আওয়ামী লীগের রাজনীতিও দেবিদ্বারের বিএনপির জন্য একটি বড় শিক্ষা। সাবেক এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদ, সাবেক এমপি এ বি এম গোলাম মোস্তফা ও রোশন আলীকে ঘিরে আওয়ামী লীগের ভেতরেও একসময় শক্তিশালী বিভাজন ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছিল। এমনকি রাজী ফখরুল ও আবুল কালাম আজাদের নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য বিরোধ দলীয় রাজনীতিতে বড় আলোচনার বিষয় হয়েছিল।

কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, দলীয় বিভাজন শেষ পর্যন্ত দলেরই ক্ষতি করে। আওয়ামী লীগের সেই অভিজ্ঞতা বিএনপির সামনে সতর্কবার্তা হিসেবে থাকা উচিত ছিল, কিন্তু বিএনপির দেবিদ্বারের নেতারা আওয়ামী লীগের ভরাডুবি থেকে শিক্ষা নেয়নি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠে কোনো দল বা দলীয় সমন্বিত বিভিন্ন প্রোগ্রাম দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে অন্য দল সহজেই সেই খালি জায়গা দখল করে নেয়। দেবিদ্বারেও এখন সেই বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। নিজেদের ভুল-বোঝাবুঝি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ধীরে ধীরে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে স্পষ্টত ফাটল ধরে যাচ্ছে।

তবে দেবিদ্বার বিএনপির জন্য দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি, বরং এখনো দলটির ঘুরে দাঁড়ানোর অপার আশা, সম্ভাবনা ও সুযোগ আছে। দলের এই ক্রাইসিস সিচুয়েশনের জায়গায় সাইদুর রহমান লিটনের কতিপয় উদ্যোগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাইদুর লিটন নিজের আলাদা বলয় শক্তিশালী করার পরিবর্তে এই উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণির বিএনপি নেতাকর্মীর মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরি করে দলকে এক জায়গায় আনার জন্য সমন্বিত চেষ্টা করছেন। একজন ভালো রাজনৈতিক উদ্যোক্তার কাজ শুধু নিজের কর্মসূচি করা নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী কিংবা অন্যদেরও সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। এক্ষেত্রে লিটনের এই সমন্বয়মূলক উদ্যোগ সফল হলে সেটি কুমিল্লা দেবিদ্বার বিএনপির জন্য নতুন রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

এখন প্রয়োজন দ্রুত উত্তর জেলা, উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য কমিটি গঠন। কমিটির মাপকাঠি হতে হবে ত্যাগ, জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা, মেধা, শিক্ষা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে নেতাদের সুসম্পর্ক। কোনো নির্দিষ্ট গ্রুপকে খুশি করার জন্য কমিটি হলে ভবিষ্যতে এই উপজেলার বিএনপির সংকট আরও বাড়বে।

মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, তারেক মুন্সী, সাইদুর রহমান লিটন, এম আউয়াল খান, রেজবিউল আহসান মুন্সীসহ সব পক্ষকে একই টেবিলে বসাতে হবে এবং অবশ্যই তাদেরকে বসতেই হবে। কর্মীদেরও বলতে হবে, বুঝাতে হবে, নেতা আলাদা হতে পারেন, কিন্তু দল একটাই বিএনপি।

দেবিদ্বারে এখন বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় লড়াই আওয়ামী লীগ, এনসিপি বা প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। এই মুহূর্তে বিএনপির সবচেয়ে বড় লড়াই নিজেদের বিভাজন, সংকট ও কোন্দলের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মাঠ দুর্বল থাকা মানে বিএনপির জন্য অপার চমৎকার সুযোগ। কিন্তু বিএনপি সেই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপিকে কঠিন মূল্য দিতে হতে পারে।

দেবিদ্বারের রাজনীতি এখন নতুন মোড়ে। বিএনপি চাইলে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন এক নেতার বা কোনো একজনের আলাদা জয় নয়, বরং বিএনপির সবার সম্মিলিত বিজয়। এখনই সময় গ্রুপিংয়ের দেয়াল ভেঙে বিএনপির ধানের শীষের পতাকার নিচে সবাইকে একসঙ্গে দাঁড় করানোর। সময় চলে গেলে মাঠ ফিরে পাওয়া কঠিন হবে। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠ কখনো কারো জন্য অপেক্ষা করে না।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ, ডিন—ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি


কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  বিএনপির রাজনীতি   মো. আজমির হোসেন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close