শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২১ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: এই সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে : শফিকুর রহমান      ছয় সপ্তাহের মধ্যে ইরানের আকস্মিক হামলার শঙ্কা      আশুলিয়ায় ভাড়া বাসা থেকে নারী-পুরুষ ও নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার      নেপালের ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আর কেউ বেঁচে নেই      দুর্নীতিবাজের অস্তিত্ব বাংলাদেশে বরদাস্ত করব না : ডা. শফিকুর রহমান      নতুন স্বৈরাচার হওয়ার পথ বন্ধ করতেই লংমার্চ : নাহিদ ইসলাম      ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ শুরু      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট : সরকারের ব্যর্থতা, নাকি সাবোটাজ
এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া
প্রকাশ: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:০৬ পিএম আপডেট: ০৫.০৯.২০২৬ ১:০৮ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

জ্বালানি হলো কোনো দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সত্যটি আরও প্রকট, কারণ দেশের শিল্পায়ন, বিদ্যুতায়ন এবং দৈনন্দিন জীবনের বিরাট অংশ প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। গৃহস্থালি চুলা থেকে শুরু করে বৃহৎ শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পরিবহন খাত—সবকিছুই গ্যাসের সরবরাহের ওপর টিকে আছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ এক অভূতপূর্ব ও তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।

এই সংকটের ফলে শিল্প উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে, রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কর্মসংস্থানে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে জানানো হয়েছে যে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট পুরোপুরি সমাধান হতে ন্যূনতম দুই বছর সময় লাগতে পারে। তবে স্বল্পমেয়াদে লোডশেডিং কিছুটা কমাতে এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

দেশের বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) সংঘটিত অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটি, যা গ্যাস সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয়ত, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে—২০১৭ সালে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ছিল ২,৭৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট, যা বর্তমানে কমে এসেছে প্রায় ১,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সরবরাহে অস্থিরতা বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি সংগ্রহ করতে বাধ্য করছে।

তবে অনেক বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষক মনে করেন, এই সংকট কেবল কারিগরি বিপর্যয় বা প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে সাবেক সরকারের আমলের সুপরিকল্পিত দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অস্বচ্ছ চুক্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের প্রত্যক্ষ পরিণতি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমর্থক কিছু আমলা, পেট্রোবাংলা ও বিপিসি কর্মকর্তা, এবং বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকরা ইচ্ছাকৃতভাবে সংকট বাড়িয়ে বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষ করে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ক্ষমতা চার্জ হিসেবে প্রচুর অর্থ পাচ্ছে—২০২৫ অর্থবছরে এই খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৪,০০০ কোটি টাকা। কিন্তু গ্যাস সংকটের নামে উৎপাদন বন্ধ রেখে এই কোম্পানিগুলো সরকারকে চাপে রাখছে এবং বকেয়া দাবি আদায়ে তৎপর হয়ে উঠেছে। এছাড়া গ্রামাঞ্চলের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে সাবেক সরকারের সমর্থকরা নিয়ন্ত্রণে থাকায় ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত লোডশেডিং করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

কিছু এলাকায় যেখানে এক ঘণ্টা লোডশেডিং দিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হতো, সেখানে পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করা হচ্ছে। গত এক দশকে বাংলাদেশ ক্রমেই আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি, বিশেষ করে এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

২০২৫ সালে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি ব্যয় ছিল প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪০,৩০০ কোটি টাকা)। এই বিপুল ব্যয় একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক খরচও বৃদ্ধি করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহে সামান্য অস্থিরতাও সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস ও স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি সংগ্রহ করতে বাধ্য হতে হয়েছে। যে জ্বালানির সরবরাহ মূলত আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল, তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ নয়। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে সরকারকে জ্বালানি নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।

সমাধান কেবল আরও বেশি জ্বালানি আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা, এলএনজি সরবরাহকারী দেশ বৈচিত্র্যকরণ, কৌশলগত মজুত বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য শক্তির (সৌর, বায়ু) দ্রুত সম্প্রসারণ প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি বাড়ানো এবং স্পট মার্কেটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে অপচয় বন্ধ করা, শিল্পকারখানা, সরকারি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক খাতে সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা জরুরি।

বিদ্যুৎ সাশ্রয় শুধু সংকটের সময় নয়, নিয়মিত জাতীয় নীতির অংশ হওয়া উচিত। জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই বেহাল পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষমতা চার্জের চুক্তি পুনর্বিবেচনা, পেট্রোবাংলা ও বিপিসির স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যক্রম কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

বর্তমান সংকট কেবল সরকারের ব্যর্থতা নয়; এর পেছনে রয়েছে সাবেক শাসকগোষ্ঠীর সুপরিকল্পিত চক্রান্ত। দেশ ও জাতিকে এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে সরকার, বিরোধী দলসহ সকল রাজনৈতিক গোষ্ঠিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। সাবেক দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাকর্মী ও আমলাদের চিহ্নিত করে প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু “জ্বালানি সংকট মোকাবিলা” নয়; বরং এমন একটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী, বহুমুখী ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করবে।

বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থাপনা। সরকারকে অবশ্যই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি স্পষ্ট পরিকল্পনা জাতীর সামনে তুলে ধরা উচিত।

এর ফলে জনগণের মধ্যে প্রস্তুতি ও স্বস্তি থাকবে। আজকের সঠিক সিদ্ধান্তই আগামী দিনের বাংলাদেশের জ্বালানি স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করতে পারে। অন্যথায় দেশকে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতে পারে।


লেখক:  রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক


কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট   সরকার  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close