দীর্ঘ সাত বছর সৌদি আরবে প্রবাসজীবন কাটিয়ে বৃহস্পতিবারই দেশে ফেরার কথা ছিল কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার তরুণ আলিফ আহমেদ চন্দনের (২৪)। স্বজনদের সঙ্গে দেখা করা, বাবা-মায়ের পাশে কিছুটা সময় কাটানো এবং দীর্ঘদিন পর আপন ঠিকানায় ফেরার আনন্দে দিনটির অপেক্ষায় ছিলেন পরিবারের সবাই। তবে দেশে ফেরার সেই দিনটিই হয়ে উঠল পরিবারের জন্য শোকের দিন।
বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পথেই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান আলিফ। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সৌদি আরবের দাম্মাম বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে তাকে বহনকারী একটি প্রাইভেটকারের সঙ্গে লরির সংঘর্ষ হয়। এতে আলিফসহ সাতজন নিহত হন।
নিহত আলিফ আহমেদ চন্দন পাকুন্দিয়া পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মরুরা গ্রামের আব্দুল হাইয়ের ছেলে। দুই বোনের একমাত্র ভাই ছিলেন তিনি। প্রায় সাত বছর ধরে দাম্মামে বসবাস করছিলেন আলিফ। প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফেরার সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছিলেন তিনি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে দাম্মাম বিমানবন্দরের দিকে যাচ্ছিলেন আলিফ। দীর্ঘদিন পর একমাত্র ছেলেকে কাছে পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন বাবা-মা ও স্বজনেরা। তাঁকে ঘিরে বাড়িতে তৈরি হয়েছিল আনন্দের পরিবেশ। কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যেই পরিবারের কাছে পৌঁছে যায় তাঁর মৃত্যুর খবর।
সৌদি আরব থেকে আলিফের মামা ওমর ফারুক বলেন, “সাত বছর ধরে দাম্মামে ছিল চন্দন। বৃহস্পতিবার বাড়ি ফেরার কথা ছিল। সবকিছু গুছিয়ে বিমানবন্দরে যাওয়ার সময় প্রাইভেটকারটি একটি লরির সঙ্গে দুর্ঘটনার শিকার হয়। এতে চন্দনসহ সাতজন মারা যান।”
স্বজনেরা জানান, এর আগে ছুটিতে দেশে এসে বিয়ে করেছিলেন আলিফ। দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি স্ত্রীকে নিয়ে নতুন করে সংসার সাজানোর স্বপ্নও ছিল তার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
দীর্ঘদিন পর স্বামী দেশে ফিরবেন—এমন অপেক্ষায় ছিলেন আলিফের স্ত্রীও। ফেরার দিন যতই ঘনিয়ে আসছিল, ততই বাড়ছিল অপেক্ষা। অথচ স্বামীকে বরণ করে নেওয়ার বদলে তাকে শুনতে হলো তার মৃত্যুর সংবাদ।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দুই বোনের একমাত্র ভাই হওয়ায় আলিফ ছিলেন পরিবারের সবার অত্যন্ত আদরের। দীর্ঘ সাত বছর পর তার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে স্বজনদের মধ্যে যে আনন্দ ছিল, দুর্ঘটনার খবর আসার পর তা মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হয়।
আলিফের মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর পর পাকুন্দিয়ার মরুরা গ্রামের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একমাত্র ছেলেকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা বাবা আব্দুল হাইসহ পরিবারের সদস্যরা শোকে ভেঙে পড়েছেন। যে বাড়িতে প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষা চলছিল, সেখানেই এখন চলছে আহাজারি। স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা পরিবারটিকে সান্ত্বনা দিতে বাড়িতে ভিড় করছেন।
দীর্ঘ সাত বছর প্রবাসে থাকার পর দেশে ফেরার পথেই আলিফের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে এলাকায়ও শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেশীরাও তরুণ এই প্রবাসীর আকস্মিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না।
পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস বলেন, “এটি খুবই দুঃখজনক ঘটনা। আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা এখনো তথ্য পাইনি। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি জেনেছি। খোঁজখবর নিয়ে পরিবারটিকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরব থেকে আলিফের মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দেশে পৌঁছালে পারিবারিকভাবে তাঁর দাফনের ব্যবস্থা করা হবে।
কেকে/সাশ