বিকেলের ঢলে হেলে পড়া সূর্য, দু’পাশজুড়ে থৈ থৈ জলরাশি আর সবুজের দিগন্তজোড়া সমারোহ—ঠিক এমন এক চোখজুড়ানো রূপের পসরা সাজিয়ে বসেছে মৌলভীবাজারের রাজনগরের কাউয়াদীঘি হাওরের ভুরভুরি বিল। এই হাওরের বুকে প্রকৃতির চমৎকার মেলবন্ধনে পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে রঙে-রূপে রঙিন ‘জোড়া সেতু’। স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘জোড়া ব্রিজ’ এখন শুধু যাতায়াতের সেতু নয়; এটি হয়ে উঠেছে নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগের ঠিকানা।
রাজনগর উপজেলার মেদিনীমহল গ্রামে মৌলভীবাজার-রাজনগর খেয়াঘাট সড়কের ওপর সেতু দুটির অবস্থান। সড়কটি সোজা করার প্রয়োজনে পুরোনো সেতুর পাশে নির্মাণ করা হয় নতুন আরেকটি সেতু। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটি সেতুই পরে এলাকাটিকে ‘জোড়া ব্রিজ’ নামে পরিচিত করে তোলে।
চাম্বলসহ নানা প্রজাতির গাছের ছায়াঘেরা পথ, দুই পাশে বিস্তীর্ণ জলরাশি আর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা বর্ণিল সেতু—সব মিলিয়ে জায়গাটি এখন ছবি তোলা, আড্ডা আর প্রকৃতির সান্নিধ্য নেওয়ার আকর্ষণীয় স্পট।
ভুরভুরি বিলের সৌন্দর্য কোনো এক ঋতুতে আটকে নেই। বর্ষায় এর রূপ যেন সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বিলের পানিতে ফুটে থাকে শাপলা-শালুক। চারদিকে পানি আর পানির বুকের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা ঘর-বাড়িগুলোকে দূর থেকে মনে হয় বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ। আর শুষ্ক মৌসুমে সেই জলরাশি সরে গিয়ে জেগে ওঠে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। যতদূর চোখ যায়, সবুজের সমারোহ। বৈশাখে সেই সবুজ ধীরে ধীরে বদলে যায় সোনালি আভায়। এই ঋতুবৈচিত্র্যই ভুরভুরি বিলকে অন্য অনেক পর্যটন স্পট থেকে আলাদা করে তুলেছে।
ছোঁয়াবালি গ্রামের বাসিন্দা শাহীনুল আলম বলেন, “জোড়া ব্রিজের চারপাশের পরিবেশ খুবই শান্ত ও ছায়াঘেরা। বর্ষায় শাপলা-শালুক আর পানির মধ্যে থাকা ঘর-বাড়িগুলো অন্যরকম সৌন্দর্য তৈরি করে। প্রকৃতির এই রূপ দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে আসেন।”
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষাকালে ছুটির দিনগুলোতে জোড়া সেতু এলাকায় দর্শনার্থীদের ভিড় সবচেয়ে বেশি থাকে। বিশেষ করে শুক্রবার ও শনিবারে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রকৃতিপ্রেমীদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো।
পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। বেকার ও স্বল্প আয়ের কিছু তরুণ পর্যটকদের ঘিরে নতুন করে আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছেন। সেতুর আশপাশে গড়ে উঠেছে ভাসমান ও অস্থায়ী কয়েকটি দোকান। কোথাও চটপটি, কোথাও শরবত, চা কিংবা পান-সিগারেট। আবার কেউ কেউ নৌকা নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন—হাওরের বুক ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য।
শরবত বিক্রেতা মিজু মিয়া বলেন, “বর্ষায় পানি থাকা পর্যন্ত পর্যটকদের ভালো ভিড় থাকে। এতে তাঁদের মতো স্থানীয় অনেকেরই আয়ের পথ তৈরি হয়েছে।”
প্রকৃতির হাতখোলা সৌন্দর্য থাকলেও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে এখনো নানা সীমাবদ্ধতায় ভুগছে ভুরভুরি বিলের জোড়া সেতু। দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ—গণশৌচাগার নেই। ফলে দীর্ঘ সময় এখানে অবস্থান করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন পর্যটকেরা। নারী ও শিশুদের জন্য সমস্যাটি আরও প্রকট। রোদ-বৃষ্টিতে বসার বা বিশ্রাম নেওয়ার জন্যও নেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। ফলে পর্যটকের চাপ বাড়লেও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা না থাকায় এই সম্ভাবনাময় স্পটটি কতটা এগোতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত এখানে গণশৌচাগার নির্মাণের পাশাপাশি রোদ-বৃষ্টিতে আশ্রয়ের জন্য শেড, বসার ব্যবস্থা এবং অন্যান্য মৌলিক পর্যটনসুবিধা গড়ে তোলা দরকার।
দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের দাবির বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান মিজান বলেন, “জনসাধারণের দুর্ভোগ লাঘব ও সুবিধা নিশ্চিত করা জেলা পরিষদের মূল লক্ষ্য। রাজনগরের জোড়া সেতু এলাকায় পর্যটকদের নিয়মিত আগমন ও যাতায়াত থাকলে পরিস্থিতি বিবেচনায় গণশৌচাগার নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পরিকল্পিত উদ্যোগ আর সামান্য কিছু অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কাউয়াদীঘি হাওরের ভুরভুরি বিলের জোড়া সেতু হয়ে উঠতে পারে মৌলভীবাজারের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র।
জল, সবুজ আর জোড়া সেতুর এই মায়াবী ঠিকানাকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারলে ভুরভুরি বিলের গল্প শুধু রাজনগরেই আটকে থাকবে না—ছড়িয়ে পড়বে দেশের পর্যটন মানচিত্রেও।
কেকে/সাশ