চারদিকে যতদূর চোখ যায়, সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে অসংখ্য টক বরই। বাগানের ভেতর ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। কেউ গাছ থেকে বরই পাড়ছেন, কেউ ঝুড়িতে তুলছেন, আবার কেউ বস্তায় ভরছেন। এরপর এসব বরই চলে যাচ্ছে ঢাকার কারওয়ান বাজার ও শ্যামবাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে।
টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের ইন্দারজানি-ঘাটাইল সীমান্ত এলাকায় প্রায় ৫০ একর জমিজুড়ে এমনই বরইয়ের বাগান গড়ে তুলেছেন কৃষি উদ্যোক্তা মোসলেম উদ্দিন।
প্রায় এক যুগ ধরে দেশীয় আগাম জাতের টক বরই চাষ করছেন তিনি। তার বাড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের কীর্ত্তনখোলা গ্রামে।
কৃষিকাজের সঙ্গে মোসলেম উদ্দিনের সম্পর্ক প্রায় ৩০ বছরের। লেবু, মাল্টাসহ বিভিন্ন ফসল চাষের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তবে আগাম টক বরই চাষে এসে তিনি পেয়েছেন আলাদা সাফল্য। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, পরিশ্রম ও পরিকল্পনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বড় পরিসরে গড়ে তুলেছেন এই বাগান।
আগস্টের শুরু থেকেই তার বাগানের আগাম টক বরই বাজারজাত শুরু হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন বাগানে ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন। ভরা মৌসুমে শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ থেকে ৬০ জনে। এতে বাগানকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাগান থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২০ বস্তা বরই ঢাকার কারওয়ান বাজার ও শ্যামবাজারে সরবরাহ করা হয়। প্রতিটি বস্তায় থাকে প্রায় ৬০ কেজি বড়ই। বর্তমানে আগাম টক বরই প্রতি কেজি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার থেকে ১ লাখ ৯২ হাজার টাকার বরই বিক্রি হচ্ছে।
মৌসুমের ভরা সময়ে বড়ইয়ের দাম কিছুটা কমে গেলেও তখন উৎপাদন ও সরবরাহ বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে এক মৌসুমে প্রায় এক কোটি টাকার বরই বিক্রি হয় বলে জানান মোসলেম উদ্দিন।
তার বাগানের টক বরইয়ের চাহিদা রয়েছে বিভিন্ন কোম্পানির কাছেও। বিশেষ করে প্যাকেটজাত আচার তৈরির জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ টক বরই কিনে থাকে। ফলে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও এ ফলের ভালো চাহিদা রয়েছে।
নিজে সফল হওয়ার পাশাপাশি মোসলেম উদ্দিন এখন এলাকার অন্য কৃষকদের কাছেও অনুপ্রেরণার নাম। তার বরইয়ের বাগান দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে উপজেলার অনেক কৃষক বড়ই চাষে আগ্রহী হয়েছেন। কেউ কেউ ইতোমধ্যে নতুন করে বাগানও গড়ে তুলেছেন।
মোসলেম উদ্দিন বলেন, “বাংলাদেশের বেকার তরুণ-তরুণীরা বরই চাষ করে সফলতা অর্জন করতে পারেন। বাংলাদেশের মাটি বরই চাষের জন্য খুবই উর্বর। সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে অবশ্যই এই পেশায় সফলতা অর্জন করা সম্ভব।”
৩০ বছরের কৃষিজীবনে নানা ফসল চাষ করলেও আগাম টক বড়ই মোসলেম উদ্দিনকে এনে দিয়েছে নতুন পরিচিতি ও সাফল্য। তার প্রায় ৫০ একরের বাগান এখন শুধু ফল উৎপাদনের জায়গা নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরিরও একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
সখীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিয়ন্তা বর্মন বলেন, “দেশি জাতের টক বরই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে মোসলেম উদ্দিন সফলতা অর্জন করেছেন। সখীপুরের মাটি বিভিন্ন ধরনের ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে এবং তাদের চাষাবাদে সহযোগিতা করতে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের সহায়তা সবসময়ই চলমান রয়েছে।”
কেকে/সাশ