চলতি বছরের প্রথমার্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিভিন্ন দেশে আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা কমে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্থানে নেমে এসেছে। কঠোর অভিবাসন নীতি ও মূল দেশগুলোর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে আবেদনের এই নিম্নমুখী ধারা তৈরি হয়েছে। তবে সামগ্রিক হ্রাসের বিপরীত স্রোতে হেঁটে ইইউতে শীর্ষ আবেদনকারী দেশগুলোর তালিকায় অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশি নাগরিকদের আশ্রয়ের আবেদন বেড়েছে ১৩ শতাংশ।
আজ বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ইইউর সদস্যদেশসহ সুইজারল্যান্ড ও নরওয়েতে (ইইউ+) আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য ৩ লাখ ৩২ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। তবে আবেদনের এই হার ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ১৭ শতাংশ কম এবং ২০২১ সালের পর থেকে বছরের প্রথমার্ধে সর্বনিম্ন আবেদনের রেকর্ড।
ইইউএএ বলেছে, ‘সিরিয়ায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে দেশটির নাগরিকদের আবেদন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি মূল উৎপত্তিস্থল ও ট্রানজিট দেশগুলোর সঙ্গে ইইউর যৌথ কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।’
সম্প্রতি তিউনিসিয়া ও মৌরিতানিয়াসহ উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে ব্রাসেলস। এই চুক্তির আওতায় অর্থনৈতিক সহায়তা ও বিনিয়োগের বিনিময়ে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে দেশগুলো। ইইউএএ বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়ালেও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো থেকে আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পায়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মোট আবেদনকারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যায় রয়েছেন আফগান নাগরিকরা। দেশটির ৩৯ হাজার হাজার নাগরিক ইইউর বিভিন্ন দেশে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। এর পরপরই দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছেন ভেনেজুয়েলা ও বাংলাদেশের নাগরিকরা। গত বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপের দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৩২৭। আর চলতি বছরের একই সময়ে বাংলাদেশিদের এই আশ্রয় আবেদন বেড়ে ১৯ হাজার ৫২১ জনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের হার প্রায় ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।’
ইইউএএ বলেছে, ‘চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে যেসব আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে, তার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশেরও কম মঞ্জুর হয়েছে। গত জুনে কার্যকর হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যেসব দেশের আবেদন মঞ্জুরের হার ২০ শতাংশের কম কিংবা যেগুলোকে ইইউ ‘নিরাপদ দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেসব দেশের আবেদন দ্রুত যাচাই-বাছাই এবং প্রত্যাখ্যাত হলে দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।’
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে আসা আবেদনের প্রায় ৫৬ শতাংশই এমন মানদণ্ডের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ তালিকায় বাংলাদেশ (২০ হাজার), মিসর (১২ হাজার), ভেনেজুয়েলা (৩৩ হাজার) ও তুরস্কের (১২ হাজার) নাগরিক রয়েছেন। তুর্কিদের (১৮ শতাংশ) ছাড়া এসব দেশের ১ম ধাপের আবেদন মঞ্জুরের হার ছিল ৫ শতাংশের নিচে।
ইইউর সদস্যদেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্স সর্বোচ্চ ৬৯ হাজার আবেদন গ্রহণ করেছে, যা মোট আবেদনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। তালিকায় এরপরই রয়েছে ইতালি (৬৬ হাজার), স্পেন (৫৫ হাজার) এবং জার্মানি (৫৫ হাজার)। এই চার দেশে মোট আবেদনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জমা পড়েছে। তবে জনসংখ্যার অনুপাতে সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়েছে গ্রিসে (২৩ হাজার)।
অপেক্ষমাণ মামলার চিত্র :
২০২৬ সালের জুন শেষে ইইউ+’এ প্রথম ধাপে প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার মামলা প্রক্রিয়াধীন ছিল; যা এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় ৮ শতাংশ কম। তবে প্রশাসনিক ও বিচারিক সব ধাপ মিলিয়ে বর্তমানে মোট অপেক্ষমাণ মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজারে।
প্রথম ধাপের বিচারে সবচেয়ে বেশি মামলা জমেছে ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের (১ লাখ ২৯ হাজার)। এরপর রয়েছে সিরিয়া (৭৬ হাজার), কলম্বিয়া (৬৪ হাজার), পেরু (৩৮ হাজার) এবং বাংলাদেশ (৩৬ হাজার)। নতুন আবেদন নিষ্পত্তির গতি বাড়লেও ছয় মাসের বেশি পুরোনো মামলার সংখ্যা অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে প্রক্রিয়াধীন মোট মামলার মধ্যে পুরোনো মামলার হার গত বছরের ৬৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশ :
প্রতিবেদনে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের চিত্র বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ৬ মাসে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি নাগরিক ইইউ+ দেশগুলোতে সুরক্ষার জন্য আবেদন করেছেন। সবচেয়ে বেশি আবেদন করা দেশগুলোর তালিকায় আফগানিস্তান ও ভেনেজুয়েলার পরই বাংলাদেশিদের অবস্থান।
এছাড়া, ইইউর কঠোর অভিবাসন নীতির অধীনে যেসব দেশের নাগরিকদের আবেদন দ্রুত বাতিল ও ফেরত পাঠানোর আওতায় রাখা হয়েছে, সেসব দেশের তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। ইইউ যেসব দেশের আবেদন স্বীকৃতির হার ২০ শতাংশের কম হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপের আবেদনের স্বীকৃতির হার নেমে এসেছে ৫ শতাংশের নিচে।
আবেদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা ও অপেক্ষমাণ মামলার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশি নাগরিকরা শীর্ষে আছেন। ইইউএএর তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপেই প্রায় ৩৬ হাজার বাংলাদেশির মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ঝুলছে। যদিও সামগ্রিকভাবে নতুন আবেদনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং পুরোনো মামলার জট না ছাড়ায় ইইউজুড়ে মোট অপেক্ষমাণ মামলার মধ্যে পুরোনো ঘটনার হার বেড়ে ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে।
সূত্র : ইইউএএ, এএফপি।
কেকে/এমএ