গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ডিসেম্বরকে ঘিরে নতুন কৌশলে এগোচ্ছে। দলীয় নেতাকর্মীদের সংঘবদ্ধ করা, পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। পাশাপাশি ডিসেম্বরকে ‘টার্গেট’ করে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টাও চলছে। ভারতে অবস্থানরত দলটির সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে বিশৃঙ্খলা ও নাশকতার ছক কষছেন।
আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলেছেন মাঠপর্যায়ের কর্মীরা। ডিসেম্বরে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন শীর্ষ নেতারা। এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর গুলশানে বিশাল মিছিল করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
মিছিলে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ নেতাকর্মী জড়ো হন। যদিও মিছিলে অংশ নেওয়ার অভিযোগে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারও হয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে গুলশানসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ ও ক্ষমতাচ্যুত দলটির ঝটিকা মিছিল এবং অর্থ দিয়ে লোক জড়ানোর বিষয়ে রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। টাকার বিনিময়ে বা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের মিছিল বা শোডাউন করার বিষয়ে বিভিন্ন সময় নানা গুঞ্জন ও অভিযোগ উঠেছে। এমনকি টাকার বিনিময়ে মিছিল করার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার দক্ষতা নিয়েও নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে।
গুঞ্জন রয়েছে, প্রশাসনের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে আছে পতিত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট। তারা নানা কৌশলে অপতৎপরতা চালাচ্ছে। মিছিল যত বড় হবে, টাকা তত বেশি দিতে হয় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে। আর তাতেই ছাড় পেয়ে যান মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা। যদিও দুই-একজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সেটিও আগে থেকেই নাকি বলে দেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এমনকি টাকার পরিমাণও আগেই নির্ধারণ করা হয়।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংঘবদ্ধ তৎপরতার প্রসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দলটি হঠাৎ করে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছে। এত মানুষ কীভাবে জড়ো হলো, গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশ প্রশাসন তা জানে কি না—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরও এ ঘটনায় প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। গতকাল শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নিজের ফেসবুক পেজে এক পোস্টে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভিআইপি/ডিপ্লোমেটিক এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠন ২০০/২৫০ লোক জড়ো হলো, মিছিল করলো! প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা কেউ আঁচ করতে পারেনি? বিষয়গুলো ভেবে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে না অশনিসংকেত!’
এর আগে শুক্রবার এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র আবু হানিফ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে আবু হানিফ লেখেন, ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদের আমলে বিরোধী দলের নেতারা শৌচাগারে গেলেও সেই তথ্য গোয়েন্দাদের হাতে থাকত। তাহলে এখন আওয়ামী লীগের মিছিলের বিষয়ে গোয়েন্দাদের কাছে অগ্রিম তথ্য থাকে না, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ তিনি অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন টাকার বিনিময়ে মিছিল করার সুযোগ করে দেন।
রাজধানীর পল্টনে বসবাস করেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনটির সহযোগী সংগঠন আওয়ামী যুবলীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কেন্দ্রীয় নেতা খোলা কাগজকে বলেন, “দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগে রাজপথে নিজেদের সংঘবদ্ধ উপস্থিতি জানান দিতে হবে। সেইসঙ্গে মিছিল-সমাবেশে বড় আকারে লোকজন জড়ো কার এবং স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।”
গুলশানে মিছিলে অংশ নেওয়া ৩২ জন গ্রেপ্তার
গুলশানে আওয়ামী লীগে নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিলে সরাসরি অংশ নেওয়ার অভিযোগে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ সময় তাদের কাছ থেকে পাঁচটি ককটেল জব্দ করা হয়। গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেন জানান, শুক্রবার দুপুরে গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ নেতাকর্মী জড়ো হন। তারা সেখানে মিছিল করার চেষ্টা করেন। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে মিছিলকারীদের দিক থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করা হয় বলে দাবি পুলিশের।
পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ দুটি রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পরে মিছিলে অংশ নেওয়ার অভিযোগে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
হাসিনার ফেরার ‘টার্গেট’ ডিসেম্বর
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ডিসেম্বরকে ‘টার্গেট’ করে সক্রিয় হচ্ছে নেতাকর্মীরা। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে বিশৃঙ্খলা ও নাশকতার ছক কষছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নিছক কোনো বক্তব্য নয়; এর পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। এর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। একইসঙ্গে এ ঘোষণার মধ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে বলে মনে করছেন তারা। তাদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো-৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে না পারলে ১ জানুয়ারি থেকেই তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, “শেখ হাসিনা মাঝে-মধ্যে দেশে ফেরার বিষয়ে যে বক্তব্য দিচ্ছেন, তা মূলত রাজনৈতিক ‘স্টান্টবাজি’। দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙা রাখার কৌশল। তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। বর্তমান বয়স ও পরিস্থিতিতে তিনি সেই আইনি লড়াই এবং দেশের সামগ্রিক বাস্তবতা মোকাবিলা করবেন কিনা, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।”
জানা যায়, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ জেলার নেতাকর্মীরা পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ রাখছেন। আধুনিক প্রযুক্তি ও এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে তারা দেশ-বিদেশের পলাতক নেতাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন।
সরকারবিরোধী তৎপরতার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের আড়ালে তহবিলও গঠন করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত অবস্থায় ককটেল ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির সরঞ্জামও জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো এবং গোপন নাশকতার ছক বাস্তবায়নের অগ্রিম বার্তা হিসাবে দেখছেন গোয়েন্দারা।
এদিকে, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একাংশ মনে করছেন, তাদের দলের সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে দলটি নতুন করে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবে। আর তিনি না ফিরলে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ফলে সব ঝুঁঁকি মাথায় নিয়ে ঘোষিত সময়েই শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন বলে আশা করছেন তারা।
দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক বৈঠকেও এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব আলোচনার অংশ হিসাবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার দেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি তার সঙ্গে আরও অনেক নেতাকর্মী দেশে ফিরবেন বলেও ঘোষণা দিয়েছেন।