এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বাজার ঘিরে তৈরি হওয়া অরাজকতা ও চরম অব্যবস্থাপনা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। পাইপলাইনের গ্যাস সংকটের কারণে সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ার পর থেকেই এ খাতে একচেটিয়া কারসাজি ও নিয়মহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যদিও আগে থেকেই খুচরা বিক্রেতারা ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে কেনার অজুহাত দিয়ে বাড়তি দামে বিক্রি করেন। অতিরিক্ত দামে গ্যাস কিনতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মাসিক খরচে বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। তারপরও বছরের পর বছর এ অরাজকতা চলছে।
মানা হয় না বিইআরসির নির্দেশনা
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু খুচরা বাজারে সেই দাম কখনোই কার্যকর হয় না। সব সময়ই বাড়তি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ কেজি এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের সরকারি দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ খুচরা বিক্রেতারা বিক্রি করছেন ২ হাজার টাকার ওপরে।
ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা
ভুক্তভোগীরা বলছেন, কার্যকর তদারকি ও কঠোর নজরদারির অভাবেই দিনের পর দিন বাজারে এ বিশৃঙ্খলা চলছে। যেন দেখার কেউ নেই। রাজধানীর অদূরে আমিন বাজারের এক হোটেল ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত সপ্তাহে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছি ১৯০০ টাকায়। আজ সেই একই গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে ২২০০ টাকায়। মাঝেমধ্যে গ্যাস সিলিন্ডার থাকলেও বিক্রেতারা নেই বলে জানান। বাড়তি টাকা দিতে চাইলে আবার সিলিন্ডার বের করে দেন। এখন হোটেল চালানোই আমাদের জন্য দায় হয়ে পড়েছে।
কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দাম
অসাধু পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা সুযোগ পেলেই সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। বেশির ভাগ সময়ই ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে ভোক্তাদের কিনতে বাধ্য করা হয়। অনেক দোকানে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘গ্যাস নেই’ নোটিস ঝুলিয়ে রেখে বেশি দামে কিনতে বাধ্য করা হয়।
ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ
ভোক্তাদের বড় একটি অভিযোগ হলো— সিলিন্ডারে নির্ধারিত ওজনের চেয়ে (যেমন ১২ কেজি) গ্যাস কম থাকে। সিলিন্ডার রিফিল বা খালি করার প্রক্রিয়ায় যথাযথ তদারকি না থাকায় সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ওজনে ঠকছেন, অথচ এর জন্য পুরো মূল্যই পরিশোধ করতে হচ্ছে।
মানহীন যন্ত্রাংশ
সিলিন্ডারের সঙ্গে ব্যবহৃত রেগুলেটর, হোস পাইপ এবং গ্যাস ভালভগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিম্নমানের। এগুলো থেকে গ্যাস লিক হয়ে প্রায়ই বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
তদারকি ও নজরদারির অভাব
দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ বা গ্যাস লিকেজের কারণে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব ঘটনায় প্রাণহানি ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। শুধু বাসাবাড়িতেই নয়, রেস্তোরাঁ, শিল্পকারখানা এমনকি হাসপাতালেও অনেক ক্ষেত্রে অগ্নি নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। আবার সরকারি বিভিন্ন সংস্থা (যেমন জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা বিস্ফোরক পরিদপ্তর) মাঝেমধ্যে নামমাত্র অভিযান চালালেও তা এ বিশাল অরাজকতা দমনে পর্যাপ্ত নয়। জনবল সংকট ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অভাবে ব্যবসায়ীরা শাস্তির তোয়াক্কা না করে কারসাজি চালিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, “সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি সম্পূর্ণ অবৈধ। নিয়মিত আমাদের অভিযান চলছে। কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তারপরও অনেকে অবৈধভাবে বাড়তি নিচ্ছে। এজন্য জনসাধারণকে সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনে আমাদের হটলাইনে (১৬১২১) যোগাযোগ করতে হবে।”
কেকে/সাশ