বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারীতে পাহাড়ি খাসজমি দখলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। করলিয়ামুরা এগ্রোফার্ম সমবায় সমিতি লিমিটেডের দখলীয় জমিতে জবরদখলের চেষ্টা, স্টাফ কোয়ার্টারে হামলা-ভাঙচুর ও বিপুলসংখ্যক রাবার চারা নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
সমিতির সদস্য ও কর্মচারীদের অভিযোগ, গত ১৫ আগস্ট রাতে তাদের স্টাফদের বাসা থেকে বের করে দিয়ে দুটি কোয়ার্টার ভাঙচুর করা হয়। একই সময় বাগানের প্রায় ১০ হাজার রাবার চারা নষ্ট করা হয়েছে। এতে প্রায় ৪৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত আলী আহমদ গুরুচ। তার দাবি, উল্টো তার জায়গার বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং তার রাবার চারা নষ্ট করা হয়েছে। এতে তার প্রায় ৩০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
দুই পক্ষের এমন পাল্টাপাল্টি অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে দখলে থাকা পাহাড়ি জমির মালিকানা, বসতি, কৃষি কার্যক্রম ও গাছের বাগান ঘিরে নতুন করে বিরোধ দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে পুলিশ। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জমির দখল, ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
১৯ বছর ধরে বাগান-খেতখামার, জীবিকার সঙ্গে জড়িত ২৫০ পরিবার :
সমিতির সদস্যদের দাবি, ২০০৭ সাল থেকে ২৮০ নম্বর আলীক্ষ্যং মৌজার পাহাড়ি খাসজমিতে তারা বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছের বাগান এবং বিভিন্ন ধরনের ক্ষেতখামার করে আসছেন। দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর ধরে ওই জমিতে সমিতির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে প্রায় ২৫০টি অসহায় ও হতদরিদ্র পরিবার।
সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, দীর্ঘ সময়ে ধাপে ধাপে সেখানে বিপুলসংখ্যক গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ৬ হাজার রাবার চারা, দ্বিতীয় ধাপে ১১ হাজার আকাশমনি চারা, তৃতীয় ধাপে ১২ হাজার রাবার চারা এবং চতুর্থ ধাপে আরও প্রায় ১২ হাজার রাবার চারা রোপণের কাজ চলমান রয়েছে।
সমিতির সদস্যদের ভাষ্য, শুধু গাছের বাগান নয়—এই জমির ওপর নির্ভর করে বহু পরিবার তাদের জীবন-জীবিকা গড়ে তুলেছে। বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে পাহাড়ি জমিকে কৃষি ও বাগানভিত্তিক উৎপাদনের আওতায় আনা হয়েছে।
রাতের আঁধারে স্টাফদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ :
সমিতির স্টাফ ও সদস্যদের অভিযোগ, ১৫ আগস্ট রাতে স্থানীয় আলী আহমদ গুরুচসহ কয়েকজন সেখানে গিয়ে সন্ত্রাসী কায়দায় হামলা চালান। এ সময় স্টাফদের বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে দুটি স্টাফ কোয়ার্টার ভাঙচুর করা হয়।
তাদের আরও অভিযোগ, হামলার সময় বাগানের প্রায় ১০ হাজার রাবার চারা নষ্ট করা হয়েছে। এতে সমিতির প্রায় ৪৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ঘটনার পর থেকে সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে দাবি সমিতির। তাদের অভিযোগ, বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দখলে থাকা জমি থেকে তাদের উচ্ছেদ করে অন্য পক্ষ দখল নেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
‘১৯ বছর ধরে আছি, হঠাৎ কেন জবরদখলের অভিযোগ’ :
সমিতির সদস্য ক্যছিং মং মার্মা, ধুনছাই মার্মা, চাইহ্লা অং মার্মা, বিধবা গুলজার বেগম, শামশুন নাহার ও সাকেরা বেগমসহ একাধিক সদস্য বলেন, প্রায় ১৯ বছর ধরে তারা এখানে কোনো ধরনের বড় ঝামেলা ছাড়াই অবস্থান করছেন।
তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন সময় ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে মাসের পর মাস পাহাড়ে রাত কাটিয়েছেন। পরিশ্রম করে বাগান ও ক্ষেতখামার গড়ে তুলেছেন। এখন হঠাৎ করে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি ওই জায়গা জবরদখলের চেষ্টা করছেন।
তারা বলেন, ‘আমাদের স্টাফ কোয়ার্টার ভাঙচুর করা হয়েছে, বিপুলসংখ্যক রাবার চারা নষ্ট করা হয়েছে। বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের দখল ও বসবাস থাকা সত্ত্বেও এখন আমাদের জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।’
‘সমিতি জায়গা জবরদখল করার অভিযোগ প্রসঙ্গে করলিয়ামুরা এগ্রোফার্ম সমবায় সমিতির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সভাপতি মো. জালাল আহমদ বলেন, ‘এগ্রোফার্ম সমবায় সমিতি কারও জায়গা জবরদখল করেনি। এ পর্যন্ত কাউকে কোনো ধরনের হামলাও করেনি।’
তিনি বলেন, ‘সমিতির কার্যক্রম দীর্ঘদিনের। বিষয়টি নিয়ে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।’
সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাবু মংহ্লাছিং মার্মা অভিযোগ করেন, আলী আহমেদ গুরুচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমিতির জায়গা বড় বড় কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর ও ভিত্তিহীন তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। সমিতির বিরুদ্ধে যেসব কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’
করলিয়ামুরা এগ্রোফার্ম সমবায় সমিতির সভাপতি মো. আব্দুর রশিদ বলেন, ‘আলী আহমেদ গুরুচ গোপনে অবৈধভাবে বাইশারীর স্থানীয় দুই ব্যক্তির কাছে জায়গা বিক্রি করবেন বলে আমাদের সমিতির ১৯ বছরের দখলীয় জায়গা দেখিয়ে আনুমানিক ৬ লাখ টাকা নিয়েছেন।’
তার দাবি, পরে যারা টাকা দিয়েছেন তারা জায়গা বুঝিয়ে দিতে বললে আলী আহমেদ গুরুচ জায়গা বুঝিয়ে দিতে পারেননি। এরপরই সমিতির দখলীয় জায়গায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, ‘পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।’
অভিযোগ অস্বীকার, উল্টো ৩০ লাখ টাকার ক্ষতির দাবি :
তবে সমিতির অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন আলী আহমদ গুরুচ। তিনি বলেন, ‘আমার জায়গার বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমার রাবার চারা নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এতে আমার প্রায় ৩০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
তার দাবি, সমিতির লোকজনই তার জায়গায় হস্তক্ষেপ করেছে। তিনি কোনো হামলা বা ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত নন বলেও দাবি করেন।
স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য মো. আনোয়ার সাদেক বলেন, ‘সমিতির প্রায় ২৫০ জন অসহায় ও হতদরিদ্র সদস্য প্রায় ১৯ বছর ধরে ওই জায়গায় বিভিন্ন ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষেতখামার করে আসছেন। আমি ২০০৭ সাল থেকে বিষয়টি দেখে আসছি।’
তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে শুনছি, কিছু স্থানীয় ব্যক্তি জবরদখলের জন্য তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে বলে শুনেছি।’
বাইশারী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ (আইসি) মো. মনজুর আহসান বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। বিস্তারিত তদন্ত শেষে জানা যাবে।’
কেকে/এমএ