ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করতে সরকারি উদ্যোগে বিয়ানীবাজার উপজেলায় নির্মাণ করা হয়েছিল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর। তবে ঘর নির্মাণ ও বরাদ্দের পরও অনেক পরিবার সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারছে না।
কোথাও কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব, কোথাও পানি, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার সংকট, আবার কোথাও ঘরের জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে উপকারভোগীদের কেউ কেউ প্রকল্পের ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। ফলে কোনো কোনো প্রকল্পে অনেক ঘর দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে।
স্থানীয় সূত্র ও উপকারভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিয়ানীবাজার উপজেলার তিনটি এলাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় দুই শতাধিক ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ ও বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে প্রকল্পের শুরু থেকেই মুল্লাকায় নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকপুর ইউনিয়নের কাছাটুল এলাল্পে উপকারভোগীদের বসবাস নিয়ে নানা সমস্যা দেখা দেয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাস্তব পরিস্থিতি, যোগাযোগব্যবস্থা, মানুষের জীবিকা এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা নিয়ে যথাযথভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। ফলে ঘর নির্মাণের পর সেখানে বসবাস করতে গিয়ে উপকারভোগীদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ঘর বরাদ্দের এক বছরের মধ্যেই কোনো কোনো প্রকল্পে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা কমতে শুরু করে। কিছু প্রকল্পে কয়েকটি পরিবার বসবাস করলেও বেশ কিছু ঘর এখন ফাঁকা পড়ে আছে। কোনো কোনো ঘরে দীর্ঘদিন ধরে তালা ঝুলছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর পেলেও সেখানে বসবাস করে জীবিকা নির্বাহ করা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা। প্রকল্পের আশপাশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় পরিবারের সদস্যদের আয়-রোজগারের জন্য দূরে যেতে হয়। এ কারণে কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
এর সঙ্গে রয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার ঘাটতির অভিযোগ। দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোনো কোনো ঘরের বিভিন্ন অংশও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
খাসা পন্ডিতপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা পারভিন বেগম বলেন, ‘তিন বছর ধরে কষ্ট করে এখানে থাকি, কিন্তু কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাই না। আগে ৪০টি পরিবার ছিল, এখন ১০-১২টি পরিবার আছে। এখানে বসবাস করার মতো কোনো পরিবেশ নেই। ঘরের অবস্থা খুব খারাপ। বাইরে থেকে সুন্দর লাগলেও ভেতরের অবস্থা খারাপ। যে কারণে বাধ্য হয়ে অনেকে এখান থেকে চলে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই, আমাদের যেন খোঁজখবর রাখা হয় এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হয়।’
একই প্রকল্পের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের ঘর দেওয়ার পর থেকে একদিনও কেউ খোঁজখবর রাখেনি। এক বছরের মধ্যে ঘরের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে।’
সম্প্রতি খাসা পন্ডিতপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের এক বাসিন্দার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগ ওঠার পর তাকে প্রকল্প এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পে নিয়মিত তদারকি না থাকলে সেখানে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ঘর নির্মাণের পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় নিয়মিত নজরদারি ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বিয়ানীবাজার উপজেলা শাখার সম্পাদক খালেদ আহমদ বলেন, ‘শুধু ঘর নির্মাণ করে দিলেই ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত হয় না। আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই, যোগাযোগব্যবস্থা, পানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।’
তিনি বলেন, ‘সরকারি অর্থে নির্মিত ঘর যাতে পরিত্যক্ত না হয়, সেজন্য প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি অনিয়ম ও ঘর বিক্রির অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী অফিসার উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, ‘বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পের কিছু ঘর জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ বিষয়ে একটি তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। যেসব ঘর সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ’
কেকে/সাশ