একসময় সিনেমার সেটে তার কাজ ছিল তারকাদের জন্য পোর্টেবল ফ্যান চালু রাখা। সেই মানুষটিই এখন তামিল সিনেমার আলোচিত অভিনেতা। ক্যারিয়ারের শুরুতে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করা সুরি আজ প্রধান নায়ক হিসেবে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। সর্বশেষ সিনেমা ‘মান্ডাডি’ এক সপ্তাহে ১০০ কোটি রুপি আয় করে তার এই উত্থানকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
সুরির চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। একই বছর রজনীকান্ত অভিনীত ‘পাদাইয়াপ্পা’ সিনেমার সেটেও কাজ করেছিলেন তিনি। তখন তিনি সিনেমার বৈদ্যুতিক বিভাগে যুক্ত ছিলেন এবং সেটে তারকাদের জন্য ব্যবহৃত পোর্টেবল ফ্যানগুলো সচল রাখার দায়িত্ব পালন করতেন।
প্রায় তিন দশক পর সেই সুরির নিজেরই তৈরি হয়েছে বিশাল ভক্তগোষ্ঠী। তার সাম্প্রতিক সাফল্যের মধ্যে ‘বিদুথালাই পার্ট-১’ (২০২৩), ‘গারুদান’ (২০২৪) ও ‘মামান’ (২০২৫) উল্লেখযোগ্য। সমালোচকদের প্রশংসা পাওয়া ‘কোট্টুক্কালি’ও তার ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
তবে সুরির জনপ্রিয়তার মোড় ঘুরে যায় ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ভেন্নিলা কাবাডি কুঝু’ সিনেমার মাধ্যমে। এতে সুব্রামানি চরিত্রে অভিনয় করে নজর কাড়েন তিনি। সিনেমার একটি দৃশ্যে ৫০টি পরোটা খাওয়ার অভিনয় এতটাই জনপ্রিয় হয় যে দর্শকদের কাছে তিনি ‘পরোটা সুরি’ নামে পরিচিতি পান।
এরপর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মূলত কমেডি চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুরি। পর্দায় তার উপস্থিতিই দর্শকদের হাসানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই পরিচিতি বদলাতে শুরু করে।
সুরির এই রূপান্তরের বড় সুযোগ আসে ভেত্রি মারানের ‘বিদুথালাই’ সিনেমায়। সিনেমাটির প্রথম পর্বে সুরিই ছিলেন প্রধান চরিত্রে। প্রায় ৫০ কোটি রুপি বাজেটের সিনেমাটি বাণিজ্যিক সাফল্য পাওয়ার পর নির্মাতাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, নায়ক হিসেবে সুরির আলাদা দর্শক টানার ক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
সিনেমাটির ক্লাইম্যাক্সে সুরি যখন প্রথমবার রাইফেল হাতে নেন, তখন প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের উচ্ছ্বাস ছিল উল্লেখযোগ্য। নির্মাতা ও প্রযোজকদের ভাষ্য, ওই মুহূর্তটি সুরির নায়ক হয়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।
এরপর ‘গারুদান’ ও ‘মামান’-এর সাফল্য তার অবস্থান আরও শক্ত করে। সর্বশেষ স্পোর্টস ড্রামা ‘মান্ডাডি’তে গ্রামীণ উপকূলীয় পটভূমিতে অভিনয় করেছেন তিনি। মুক্তির এক সপ্তাহের মধ্যে সিনেমাটির আয় ১০০ কোটি রুপি ছাড়িয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত এটি সর্বোচ্চ আয় করা তামিল সিনেমাগুলোর একটি।
বিশেষ করে তামিলনাড়ুর ছোট শহর ও গ্রামীণ এলাকার দর্শকদের মধ্যে সুরির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। সিনেমাটির প্রযোজক এলরেড কুমারের মতে, ‘মান্ডাডি’ এমন দর্শকশ্রেণির কাছে সাড়া ফেলেছে, যাদের কাছে পৌঁছানো তামিল সিনেমার অনেক তারকার জন্যও কঠিন।
দক্ষিণ তামিলনাড়ুর পরিবেশক ও প্রেক্ষাগৃহ মালিক তিরুপুর সুব্রামানিয়ামের ভাষ্য, সুরির তারকাখ্যাতি খুব বেশি প্রচার ছাড়াই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে। তার মতে, ‘বি’ ও ‘সি’ সেন্টার হিসেবে পরিচিত ছোট শহর ও গ্রামীণ বাজারে সুরি অন্যদের তুলনায় দ্রুত নিজের জায়গা তৈরি করেছেন।
তবে নিজের সাফল্যকে কোনো পরিকল্পিত তারকা হয়ে ওঠার গল্প হিসেবে দেখেন না সুরি। তার মতে, প্রায় ৩০ বছরের পরিশ্রমের ফলেই আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন তিনি।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলোর কথা স্মরণ করে সুরি বলেন, সিনেমার সেটে তার প্রথম পারিশ্রমিক ছিল মাত্র ৫০ রুপি। আর আজ তার সিনেমা ১০০ কোটি রুপি আয় করছে।
সুরির ভাষায়, জীবনের শুরু কোথায়—তা ভবিষ্যতের সীমা নির্ধারণ করে না। পথে দেরি হতে পারে, বাধা আসতে পারে; কিন্তু কেউ নিজে হাল না ছাড়লে সেই বাধা তাকে থামাতে পারে না।
কমেডিয়ান হিসেবে দর্শকদের হাসানো সেই অভিনেতার নায়ক হয়ে ওঠার গল্প তাই শুধু সাফল্যের হিসাব নয়; এটি প্রায় তিন দশকের অপেক্ষা, শেখা ও নিজের ওপর বিশ্বাস ধরে রাখার গল্প।
সূত্র: দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়া
কেকে/সাশ