একসময় গ্রামের আনাচে-কানাচে, রাস্তার পাশে কিংবা পতিত জমিতে আপনমনে বেড়ে উঠত লজ্জাবতী গাছ। মানুষের তেমন কোনো পরিচর্যা ছাড়াই প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এই ছোট্ট গাছটি ছিল গ্রামীণ জনপদের অতি পরিচিত উদ্ভিদ। কেউ পা দিয়ে স্পর্শ করলেই পাতাগুলো লজ্জায় নুয়ে পড়ার মতো বন্ধ হয়ে যেত। এ বৈশিষ্ট্যের কারণেই গাছটির নাম হয়েছে ‘লজ্জাবতী’।
তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে গ্রামীণ পরিবেশ। বাড়িঘর নির্মাণ, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত চাষাবাদ, আগাছানাশকের ব্যবহার, রাস্তার পাশ পরিষ্কারসহ নানা কারণে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় দিন দিন কমে যাচ্ছে ঔষধি গুণে সমৃদ্ধ এই উদ্ভিদ। একসময় যেখানে সহজেই চোখে পড়ত লজ্জাবতী, এখন সেখানে খুঁজেও অনেক সময় দেখা মেলে না।
লজ্জাবতী মূলত একটি কাঁটাযুক্ত ছোট গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘মিমোসা পুডিকা’। স্পর্শ বা আঘাত পেলে পাতাগুলো দ্রুত গুটিয়ে নেওয়ার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে শিশু-কিশোরদের কাছেও গাছটি ছিল বেশ আকর্ষণীয়।
উদ্ভিদ বিজ্ঞানের মতে, লজ্জাবতীর পাতা শুধু মানুষের স্পর্শেই নয়, তাপের প্রভাবে বা সন্ধ্যা বেলাতেও বন্ধ হয়ে যায়। মূলত সিসমোন্যাস্টিক চলনের প্রভাবেই এর পাতা বন্ধ হয়ে যায়। থোকায় থোকায় ফুল ফোটে। এর ফলগুলো চ্যাপ্টা, বাঁকা-লম্বাটে, ৮-১৩ সেন্টিমিটার, এতে ৪-১০ টি বীজ থাকে। পরিপক্ব ফল কয়েকটি খণ্ডে বিভক্ত হয়, প্রতি খণ্ডে ১টি করে বীজ থাকে। জুন থেকে ফুল ফোটা শুরু হয়ে শেষ হয় অক্টোবর মাসে। লজ্জাবতীর আদি নিবাস মধ্য আমেরিকার মেক্সিকোতে। এ দেশে সাধারণত দুই প্রকারের লজ্জাবতী উদ্ভিদ দেখা গেছে। এর একটি লাল অপরটি সাদা।
গ্রামবাংলার প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা এই উদ্ভিদটি একই সঙ্গে লোকজ চিকিৎসায়ও বহুল পরিচিত।
গ্রামীণ সমাজে দীর্ঘদিন ধরে লজ্জাবতী গাছের বিভিন্ন অংশ লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। বিশেষ করে এর শিকড়, পাতা ও অন্যান্য অংশ নিয়ে বিভিন্ন ভেষজ ব্যবহারের কথা প্রচলিত রয়েছে। তবে এসব ব্যবহার বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার বিকল্প নয়; রোগের চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দশক আগেও ব্রাহ্মণপাড়ার বিভিন্ন গ্রাম, রাস্তার ধারে, বাড়ির আশপাশ ও পতিত জমিতে প্রচুর লজ্জাবতী দেখা যেত। বর্ষা ও শরৎ মৌসুমে সবুজ পাতার মাঝে ছোট ছোট গোলাপি ফুল নিয়ে গাছগুলো প্রকৃতিকে অন্যরকম সৌন্দর্য দিত। শিশুরা খেলাচ্ছলে পাতায় হাত দিয়ে গাছটির ‘লজ্জা পাওয়া’ দেখত।
কিন্তু বর্তমানে সেই দৃশ্য অনেকটাই বিরল। কৃষিজমিতে আগাছানাশকের ব্যবহার এবং অপরিকল্পিতভাবে জমি ও রাস্তার পাশ পরিষ্কার করার ফলে লজ্জাবতীর স্বাভাবিক বিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামীণ জীবনে পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংকুচিত হওয়ায় অনেক দেশীয় উদ্ভিদের মতো লজ্জাবতীও হারিয়ে যাওয়ার পথে।
উদ্ভিদপ্রেমীদের মতে, প্রকৃতির ছোট-বড় প্রতিটি উদ্ভিদেরই নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। লজ্জাবতীর মতো দেশীয় উদ্ভিদ সংরক্ষণে বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারের পতিত জায়গা ও অনাবাদি জমিতে এসব গাছ নির্বিচারে ধ্বংস না করে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পর্যায়ে দেশীয় ঔষধি উদ্ভিদ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে।
ব্রাহ্মণপাড়ার প্রকৃতি থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসা লজ্জাবতী শুধু একটি গাছ নয়, এটি গ্রামীণ জনপদের প্রকৃতি ও শৈশবের স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে থাকা এক পরিচিত নাম। প্রকৃতির এই ছোট্ট উদ্ভিদটিকে রক্ষা করা গেলে একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও পরিচিত হতে পারবে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় উদ্ভিদের সঙ্গে।
কেকে/সাশ