সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও কিশোর গ্যাং আতঙ্কে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ক্রেতারা, অভিযোগ আবাসন ব্যবসায়ীদের। আবার অনেক প্লট মালিকদের কাগজপত্র শতভাগ সচ্ছ থাকলেও হাউজিং কর্তৃপক্ষ প্লট বুঝিয়ে না দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে একাধিক ব্যক্তির। সবমিলিয়ে জমি বেচাকেনায় ধস নেমেছে এলাকাটিতে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জমি, প্লট ও ফ্ল্যাটের বেচাকেনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। স্থানীয় প্রোপার্টি ব্যবসায়ী ও জমির মালিকদের দাবি, গত কয়েক বছরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে দেশে একটি গণঅভ্যুত্থানের পর বেচাকেনা ৫০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে জমি ও ফ্ল্যাটের দামের ওপরও। অনেক হাউজিং প্রকল্পে শত শত রেডি ফ্ল্যাট ও প্লট অবিক্রিত পড়ে আছে। বেচাকেনা না হওয়ার কারণ এলাকাটিতে সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম বাড়ছে।
আবাসন ব্যবসায়ীদের একাংশ বলছেন, মানুষের হাতে নগদ অর্থের সংকটের পাশাপাশি মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও জমি দখলের অভিযোগ ক্রেতাদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে ঢাকার অন্যান্য এলাকার অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা মোহাম্মদপুরে জমি বা ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহ দেখালেও পরে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত থেকে সরে যাচ্ছেন বলে দাবি তাদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক আবাসিক ও হাউজিং প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেড ও মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটি, নবোদয় হাউজিং, নবীনগর হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান, একতা হাউজিং, তুরাগ হাউজিং, শ্যামলী হাউজিং, আক্কাস নগর প্রকল্প, সাতমসজিদ হাউজিং, বাঁশবাড়ী, কাটাসুর, বসিলা সিটি ডেভেলপার্স, ওয়েস্ট ধানমন্ডি হাউজিং ও মেট্রো হাউজিং উল্লেখযোগ্য। এ সব এলাকায় বিপুলসংখ্যক প্লট ও ফ্ল্যাট রয়েছে অবিক্রি।
তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে সুনির্দিষ্টভাবে কতটি হাউজিং বা আবাসন প্রকল্প রয়েছে, তার কোনো নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
কাদেরাবাদ হাউজিংয়ের প্লট মালিক মনির হোসেন মিয়া জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি একটি প্লট বিক্রির চেষ্টা করছেন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। তার ভাষ্য, গত তিন-চার মাসে কয়েকজন ক্রেতা যোগাযোগ করলেও শেষ পর্যন্ত কেউ জমি কিনতে রাজি হননি।
মনির হোসেন বলেন মিয়া বলেন, ‘বনানী এলাকার একজন ক্রেতা প্লটটি কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরিবারের সদস্যরা মোহাম্মদপুরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা বলে সেখানে জমি কিনতে রাজি হননি।’
আবাসন ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ অবশ্য জমি-ফ্ল্যাটের বেচাকেনা কমে যাওয়ার জন্য মানুষের হাতে অর্থের সংকটকেও অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বর্তমানে অনেক মানুষ নতুন করে জমি বা ফ্ল্যাট কেনার পরিবর্তে নিজেদের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে শুধু ক্রেতার সংকটই নয়, জমি দখল নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো এলাকায় নিজেদের কেনা প্লটের দখল বুঝে পেতে মালিকদের নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়। এমনকি রাতারাতি প্লট দখলের অভিযোগও রয়েছে এলাকাটিতে। আবার কিছু হাউজিং প্রকল্পের বিরুদ্ধে ক্রেতাকে জমির দখল বুঝিয়ে দিতে গড়িমসির অভিযোগও করেছেন প্লট মালিকরা।
১৩ বছর পর দেশে ফিরে প্লট হারানোর অভিযোগ
নবীনগর হাউজিংয়ের বিরুদ্ধে এমনই একটি অভিযোগ করেছেন লন্ডনপ্রবাসী সেন্টু হাওলাদার। তার দাবি, প্রায় ১৩ বছর আগে তিনি ওই হাউজিং প্রকল্পে একটি প্লট কেনেন। পরে প্লটটি ভোগদখলে রেখে সেখানে পাঁচ কক্ষের একটি টিনশেড বাড়িও নির্মাণ করেন। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পর দেশে ফিরে তিনি দেখতে পান, তার প্লটটি হাউজিং কর্তৃপক্ষ দখল করে নিয়েছে।
সেন্টু হাওলাদারের অভিযোগ, এর আগে প্লটটি তার নামে ছাড়পত্র দেওয়ার পর একই প্লটের বিষয়ে অন্য ব্যক্তিকেও ছাড়পত্র দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে তিনি ছাড়াও আরও অনেকে বিভ্রান্তি ও ভোগান্তির শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। এবিষয়ে একটি মামলাও চলমান রয়েছে আদালতে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে , বিভিন্ন হাউজিং প্রকল্পের উন্নয়নের জন্য রাস্তা, মসজিদ ও খেলার মাঠসহ বিভিন্ন কাজে নির্ধারিত জায়গার একটি অংশ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যেমন একটি প্লটের ২৫℅ হাউজিং রাস্তাঘাটের জন্য কেটে নিয়ে গেলেও এ সব জায়গা আবার বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন অনেকে।
এক ভুক্তভোগী জানান একটি হাউজিং প্রকল্প তৈরি করার সময় গ্রাহককে জানান রাস্তাঘাটের জন্য ২৫% কেটে নিয়ে তারা রাস্তাঘাট তৈরি করবে, কিন্তু হাউজিং যে নিজেরা প্লট বিক্রি করে সেই জমি তারা কোথায় পায়? এগুলো সরকারের তদন্ত করা উচিত।
স্থানীয় এক ভুক্তভোগীরা বলেন, হাউজিং গুলোকে সরকারিভাবে ভূমি কর্মকর্তাদের কঠোর নজরদারি করাসহ সরেজমিনে সঠিক ক্রেতাদের প্লট হস্তান্তর করা গেলে অনেক ভূমি দখল ও চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
স্থানীয় কয়েকজন জমির মালিক ও আবাসন ব্যবসায়ীর ভাষ্য, নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া ভয় কাটানো না গেলে মোহাম্মদপুরের আবাসন খাতে স্থবিরতা আরও বাড়তে পারে।
তাদের মতে, জমি-ফ্ল্যাটের বেচাকেনা স্বাভাবিক করতে হলে সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও জমি দখলের অভিযোগের কার্যকর সমাধানের পাশাপাশি ক্রেতাদের আস্থাও ফিরিয়ে আনতে হবে।
কেকে/এআই