মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ভাতার টাকা আত্মসাৎ ও অনিয়মের অভিযোগ আবারও সামনে এসেছে। ভাতা পরিশোধের দায়িত্বে থাকা ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিনিধি ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী চা শ্রমিকরা।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্ব) বিকালে উপজেলার কালাপুর ইউনিয়নের মাজদিহি চা-বাগানের ৩০ জন ভুক্তভোগী চা-শ্রমিক যৌথ স্বাক্ষরিত লিখিত অভিযোগ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর জমা দিয়েছেন।
প্রাপ্য টাকা না দিয়ে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং প্রতারণামূলকভাবে টিপসই নেওয়ার এ ঘটনায় ক্ষোভ ফুঁসে উঠছেন চা-শ্রমিকরা। একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতারক চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থাগ্রহণে প্রশাসনকে অনুরোধ জানিয়েছেন তারা। এ দিকে অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টি সত্যতা যাচাইয়ে সরেজমিন বাগানে তদন্তে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএন) মো. জিয়াউর রহমান।
চা-শ্রমিকদের লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সরকার কর্তৃক চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ব্যাংক এশিয়া শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভৈরবগঞ্জ শাখার মাধ্যমে এ ভাতার টাকা পরিশোধ করা হয়। তবে চলতি মৌসুমের বরাদ্দকৃত ভাতার টাকা তোলার উদ্দেশ্যে গত ২০ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখায় চা শ্রমিকরা সরেজমিন গিয়ে ভাতা উত্তোলনে নানা অনিয়মের শিকার হন।
নিয়ম অনুযায়ী প্রতিজন শ্রমিকের ৭ হাজার ৮০০ টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে অর্ধেকেরও কম–কাউকে ৩ হাজার, আবার কাউকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা।
শ্রমিকদের অভিযোগ, ‘ডকুমেন্ট প্রসেসিং’-র নামে এনআইডি কার্ডের ফটোকপিতে প্রতারণামূলকভাবে তাদের টিপসই ও স্বাক্ষর নেওয়া হয়। রশিদে ভাতার পূর্ণ অংক না দেখিয়ে আংশিক টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এ সময় শ্রমিকরা টাকা কম দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানালে ব্যাংক এশিয়ার দায়িত্বে থাকা প্রতিনিধি ও সহযোগীরা অশালীন আচরণ করেন এবং কোনো প্রকার সাহায্য না করে এড়িয়ে যান।
লিখিত অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এশিয়া ব্যাংকের স্টেটমেন্ট বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ভাতাভোগী চা শ্রমিক রাম কুমারি নুনিয়া, রাজু রায়, সবিতা কর্মকার এবং সবিতা বাউরীর মতো পরিশ্রমী চা শ্রমিকরা জালিয়াতির শিকার হয়েছেন। হিসাবের সংশ্লিষ্ট ফর্দে এ প্রতারণার তথ্য পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। শ্রমিকদের দাবি, ভাতা পরিশোধে তালিকাভুক্ত সকল শ্রমিকরাই এ ধরণের অনিয়ম-প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মাজদিহি চা-বাগানের নারী শ্রমিক সন্তুকি রায় বলেন, ‘আমাদের মতো অসহায় চা-শ্রমিকদের ভাতার টাকা এভাবে মেরে খাওয়া চরম অন্যায়। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও বকেয়া টাকা পাওয়ার আকুল দাবি জানাচ্ছি।’
চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সাবেক সভাপতি অনিল কর্মকার বলেন, ‘সরকার এ টাকা আমাদের দিয়েছে। এখানে কারো ভাগ বসানোর অধিকার নেই। দুই হাজার ভুক্তভোগীর টাকা ব্যাংকের লোক কেন কেটে রাখবে?’
এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং ভৈরববাজার শাখার প্রতিনিধির মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে কোনা সাড়া মিলেনি। তবে ব্যাংক এশিয়ার মৌলভীবাজার জেলা শাখার ব্যবস্থাপক তুহিন আহমদ ইয়ামি দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, ‘ঘটনাটি মৌখিকভাবে শুনেছি, তবে এখনো লিখিত কাগজ পাইনি। মৌখিকভাবে যতজনের কথা বলা হচ্ছে, সংখ্যাটি তত নয়। অনেকের টাকা সরাসরি বিকাশ বা রকেটেও যায়। বিষয়টি নিয়ে সামনাসামনি কথা বলা প্রয়োজন।’
মুঠোফোনে প্রতিবেদককে তিনি মৌলভীবাজার অফিসে গিয়ে সরাসরি কথা বলার জন্য বলেন।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. সোয়েব হোসেন চৌধুরী জানান, বাগানে বিষয়টি নিয়ে নাকি শালিস-বৈঠকও হয়েছে। ভুক্তভোগী শ্রমিকরা লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
মো. জিয়াউর রহমান দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, ‘চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ভাতার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সত্যতা যাচাইয়ে দ্রুতই সরেজমিনে বাগানে তদন্তে যাবো এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবো। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ দিকে দৈনিক খোলা কাগজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির টাকা বণ্টনে ব্যাংক এশিয়ার এজেন্টদের মাধ্যমে চা-শ্রমিকদের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগে শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ও কালিঘাট ইউনিয়নে ব্যাংক এশিয়া এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে একই ধরণের বড় দুটি অনিয়মের ঘটনা ঘটেছিল।
২০২৫ সালের ১৭ জুন উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বৌলাশীর গ্রামের ব্যাংক এশিয়ার প্রতিনিধি সৌরভ কান্তি দাশ ২৪ জন চা-শ্রমিকের আঙুলের ছাপ (বায়োমেট্টিক) নিয়ে ১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে তা গোপাল লোহা নামের অন্য এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করেন। দৈনিক খোলা কাগজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রতিবেদন ছাপা হলে তৎকালীন ইউএনওর নির্দেশে এবং উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের মামলায় পুলিশ ওই দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করে। পরবর্তী উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ভুক্তভোগীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এ ছাড়া গত বছরের ২২ জুন কালিঘাট ইউনিয়নের আশিশ কর্মকার ও অপূর্ব তাঁতি নামের দুই ব্যাংক এশিয়া ‘মাইক্রো মার্চেন্ট’-র বিরুদ্ধে নির্ধারিত ৬ হাজার টাকার ভাতা থেকে জনপ্রতি ১০০-২০০ টাকা পর্যন্ত অবৈধ কমিশন কাটার অভিযোগ উঠে। ওই ঘটনায় পরবর্তী ভুক্তভোগী শ্রমিকদের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছিল।
বারবার একই প্রক্রিয়ায় ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে চা-শ্রমিকদের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় স্থানীয় সমাজকর্মী ও শ্রমিক নেতাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা শ্রীমঙ্গলে এ ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
কেকে/এআই