কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের কৃষকদের জন্য বরাদ্দ সরকারি সার কচ্ছপিয়া ইউনিয়নে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। সরকারের নবঘোষিত ‘সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫’ লঙ্ঘন করে এক ইউনিয়নের ডিলার অন্য ইউনিয়নে ব্যবসা পরিচালনা করায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গর্জনিয়ায় কৃষকদের কাছে চড়া মূল্যে সার বিক্রির পাশাপাশি অবশিষ্ট সার মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় পাচার করা হচ্ছে। প্রতিদিন গর্জনিয়া বাজার থেকে শত শত বস্তা বিভিন্ন ধরনের সার মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে স্থানীয় কৃষকদের চড়া দামে সার কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
জানা গেছে, গর্জনিয়া ইউনিয়নের জন্য ‘ফজল করিম ট্রেডার্স’ নামে ডিলারশিপ রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিক শাহেদুল ইসলাম গর্জনিয়া ইউনিয়নে ব্যবসা না করে কচ্ছপিয়া ইউনিয়নে অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সেখানে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে সার পাচার করা হচ্ছে এবং বস্তায় উল্লেখিত মূল্যের প্রায় দ্বিগুণ দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে সারের ডিলার শাহেদুল ইসলামের সঙ্গে বেশ কয়েকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি প্রতিবেদকের ফোন ধরেননি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গর্জনিয়া ইউনিয়নের জন্য অনুমোদিত সার ডিলার নির্ধারিত সীমানার পরিবর্তে কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের বাজারে গোডাউন স্থাপন করে সার বিক্রি করছেন। অথচ গত বছরের নভেম্বরে কার্যকর হওয়া নতুন নীতিমালার ১.৪.৪ ও ১.৪.৭ ধারা অনুযায়ী, কোনো ডিলার তার নির্ধারিত ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডের বাইরে সার স্থানান্তর বা বিক্রি করতে পারবেন না।
ভুক্তভোগী কৃষকদের বক্তব্য
গর্জনিয়া ইউনিয়নের কৃষক রহিম উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নের সার কেন অন্য ইউনিয়নে গিয়ে কিনতে হবে? সেখানে যেতে আমাদের অতিরিক্ত ভাড়ার টাকা গুনতে হচ্ছে। সরকারি লোক হয়ে তারা যদি সরকারি নিয়ম না মানে, তবে আমরা সাধারণ মানুষ কোথায় যাব?’
আরেক কৃষক আব্দুল জলিল আক্ষেপ করে বলেন, ‘নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, সার ডিলার হবেন আমাদের ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং সার বিক্রির ব্যবস্থা থাকবে আমাদের হাতের কাছে। কিন্তু ডিলার কচ্ছপিয়ায় বসে থাকায় আমরা ন্যায্যমূল্যে সময়মতো সার পাচ্ছি না।’
নীতিমালা যা বলছে
নীতিমালা-২০২৫ অনুযায়ী, ডিলারশিপ প্রথাকে আরও স্বচ্ছ করতে প্রতিটি ইউনিয়নে তিনজন করে ডিলার নিয়োগ এবং সাব-ডিলার প্রথা পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। নীতিমালার ১.১.৫ ধারা অনুযায়ী, ডিলারকে অবশ্যই নিজ ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ‘ইউনিট’-এর মধ্যেই বিক্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করতে হবে।
অন্য ইউনিয়নে সার বিক্রি করাকে ‘কালোবাজারি ও অবৈধ স্থানান্তর’ হিসেবে গণ্য করে ডিলারশিপ বাতিলের বিধান রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘নীতিমালা-২০২৫ অত্যন্ত কঠোর। কোনো ডিলারের এক ইউনিয়নের সার অন্য ইউনিয়নে বিক্রির সুযোগ নেই। গর্জনিয়ার ডিলার কচ্ছপিয়ায় ব্যবসা করছেন—এমন লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা নেব। একই সঙ্গে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হবে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিকের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘এক ইউনিয়নের সার অন্য ইউনিয়নে বিক্রি করার সুযোগ নেই। বিষয়টি রামু উপজেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করছি। তারা কীভাবে বিষয়টি ঘটছে, তা দেখবেন।’
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকায়নে সরকার যে নতুন নীতিমালা করেছে, মাঠপর্যায়ে ডিলারদের এমন স্বেচ্ছাচারিতা তার সুফল বাধাগ্রস্ত করছে। দ্রুত সংশ্লিষ্ট ডিলারকে গর্জনিয়া ইউনিয়নে ফিরিয়ে এনে কৃষকদের জন্য নির্ধারিত সার যথাযথভাবে বিতরণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কেকে/সাশ