ভোলার তজুমদ্দিনে প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। বর্তমানে সরকারি এ হাসপাতালটিতে চারজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। গত দুই মাসে মোট ৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়ে ৩৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এমতাবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে জনবল সংকটের কারণে প্রত্যাশিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এলাকাবাসী। হাসপাতালটিতে উপজেলা ছাড়াও বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে অনেক রোগী বিনা মূল্যে চিকিৎসা নিতে এসে বিপাকে পড়ছেন।
সূত্রে জানা গেছে, তজুমদ্দিনের মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলের দেড় লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র ভরসা এই সরকারি হাসপাতালটি। কিন্তু চরাঞ্চলের জরুরি রোগীকে নদীপথে বহন করার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। বিগত সরকারের বরাদ্দকৃত সরকারি একমাত্র নৌ-অ্যাম্বুলেন্সটি বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এটি দিয়ে এখন পর্যন্ত একজন রোগীকেও বহন করা সম্ভব হয়নি। নৌ-অ্যাম্বুলেন্সটির দিকে তাকালে মনে হয় যেন রাষ্ট্রের টাকা নদীর জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তজুমদ্দিন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি শুরু থেকেই ৩১ শয্যা নিয়ে কার্যক্রম শুরু করলেও তখন থেকেই জনবল সংকটসহ নানাবিধ সমস্যা লেগে রয়েছে। চিকিৎসকের ৩১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে রয়েছেন আটজন চিকিৎসক। তাদের মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপের সময়ে দুজন ছুটিতে রয়েছেন। ফার্মাসিস্টের দুটি পদ থাকলেও বর্তমানে দুটিই শূন্য। হাসপাতালের হিসাবরক্ষকের পদটিও বর্তমানে শূন্য রয়েছে। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফার) ও ল্যাব টেকনোলজিস্টের পদও শূন্য রয়েছে। অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটরের তিনটি পদ থাকলেও বর্তমানে তিনটিই শূন্য। স্টোরকিপারের একটি পদ থাকলেও সেটিও শূন্য রয়েছে। স্বাস্থ্য পরিদর্শকের দুটি পদের বিপরীতে দুটিই শূন্য। স্বাস্থ্য সহকারীর ৩২টি পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে আটটি। অফিস সহায়কের চারটি পদের মধ্যে তিনটি শূন্য।
বর্তমান সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ দিন দিন বেড়ে চলায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পাঁচটি পদ থাকলেও চারটিই শূন্য হওয়ায় পরিচ্ছন্নতা ঠিকঠাক না হলে হাসপাতালটি ডেঙ্গু আক্রান্তদের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হাসপাতালের বাবুর্চির দুটি পদ থাকলেও দুটিই শূন্য। তিনটি ওয়ার্ডবয়ের পদের বিপরীতে দুটি শূন্য থাকায় একজনকে তিনজনের কাজ করতে হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে হাসপাতালটিই এখন রোগীতে পরিণত হয়েছে।
চিকিৎসা নিতে আসা উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, “আমার দুই বছরের ছেলে মাহাদিকে ডাক্তার দেখানোর জন্য হাসপাতালে নিয়ে আসি। তবে হাসপাতালে ডাক্তার সংকটের কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। হাসপাতালটিতে কোনো শিশু কনসালট্যান্ট না থাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা সদর কিংবা বরিশাল, নতুবা রাজধানী ঢাকায় যেতে হয়।”
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. দিব্যেন্দু রায় রাজীব বলেন, “বর্তমানে হাম ও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এখন যে পরিমাণ ডাক্তার আছে, তাতে চিকিৎসাসেবা দেওয়া কিছুটা হলেও কষ্টসাধ্য হয়। যদি আরও চিকিৎসক পদায়ন করা হয়, তবে রোগীদের চিকিৎসাসেবা আরও ভালো হবে।”
হাসপাতালে কনসালট্যান্টের চারটি পদ থাকলেও সেগুলোও শূন্য রয়েছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের নিয়ে যেতে হয় সদর হাসপাতালে, নতুবা বরিশাল কিংবা ঢাকায়। শুরু থেকে হাসপাতালটিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন না করায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইউনিট চালু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে এলাকার সাধারণ রোগীরা চিকিৎসাসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে দাবি করছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। বেশির ভাগ রোগীকেই ডাক্তাররা ভোলা সদর হাসপাতালে রেফার করেন।
হাসপাতালটির দেয়ালে রোগীদের সরবরাহ করার জন্য ওষুধের বিশাল একটি তালিকা টানানো থাকলেও অধিকাংশ ওষুধই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরবরাহ করে না। এক কথায় বলতে গেলে, তজুমদ্দিনে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, জনবল ও ওষুধপত্রের সংকটে চিকিৎসাসেবা একেবারেই নাজুক হয়ে পড়ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুব কবিরের সঙ্গে জনবল সংকট ও বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ডেঙ্গুর সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা হাসপাতালে সরকার নির্ধারিত খরচে করা হয়। বর্তমানে প্রতিনিয়ত ডেঙ্গু নিয়ে জনসাধারণকে সচেতন করছি। জনবলের যে সংকট রয়েছে, তা নিয়ে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। আশা করি, দ্রুত সময়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক দেওয়া হবে।”
তবে এ অঞ্চলের মানুষের জন্য একজন গাইনি কনসালট্যান্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালে বর্তমানে যে ওষুধের সংকট রয়েছে, তা এই সপ্তাহের মধ্যে কেটে যাবে।
কেকে/ এমএস