একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দিয়েছিল হাসান বিশ্বাসের জীবন। ১২ বছর আগে নসিমন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যায়, অকেজো হয়ে পড়ে একটি হাতও। এরপর থেকেই হুইলচেয়ার হয়ে ওঠে তার জীবনের একমাত্র চলার সঙ্গী।
একসময় নসিমন চালানোসহ বিভিন্ন কাজ করে স্ত্রী, সন্তান ও মাকে নিয়ে সংসার চালাতেন হাসান বিশ্বাস। ছিল স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন, ছিল পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা তার সেই স্বাভাবিক জীবনকে থামিয়ে দেয়। দুর্ঘটনার পর নিজের দৈনন্দিন কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়ে তার। খাওয়া, গোসল করা, বিছানায় ওঠা-নামা—প্রায় প্রতিটি কাজেই স্ত্রী ও সন্তানদের সহযোগিতা নিতে হয়।
একসময় যে মানুষটি পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, তাকেই জীবনের কঠিন সময়ে পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়। তবুও হার মানেননি হাসান। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গী করেই ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে না নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি। হুইলচেয়ারে বসেই চালাচ্ছেন ছোট্ট একটি চানাচুর ও বিস্কুটের দোকান।
ফরিদপুরের বোয়ালমারী পৌরসভার সোতাশী রহমানির আরাবিয়া দাখিল মাদ্রাসার সামনে প্রতিদিন দেখা মেলে তাঁর। হুইলচেয়ারে বসে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেন, চানাচুর-বিস্কুট বিক্রি করেন। সামান্য এই আয় দিয়েই নিজের ও পরিবারের জন্য কিছু করার চেষ্টা তাঁর।
হাসান বিশ্বাস বলেন, “দুর্ঘটনার পর আমার জীবনটা একেবারে বদলে গেছে। আগে কাজ করতাম, সংসার চালাতাম। এখন নিজের অনেক কাজও নিজে করতে পারি না। স্ত্রী-সন্তান আমাকে দেখাশোনা করে। কিন্তু আমি কারও বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। যতটুকু পারি, এই দোকানটা চালাই। ভিক্ষা করতে চাই না, নিজের পরিশ্রমে কিছু করে খেতে চাই।”
কথাগুলো বলতে বলতে হয়তো পুরোনো দিনের স্মৃতি মনে পড়ে যায় হাসানের। যে মানুষটি একদিন পরিবারের জন্য ছুটে বেড়াতেন, আজ সেই মানুষটিই হুইলচেয়ারে বসে ছোট্ট দোকানের সামনে বসে জীবনের হিসাব মেলান। দোকানের বেচাকেনা খুব বেশি নয়, তবুও প্রতিদিন দোকান খোলার মধ্যেই খুঁজে পান বেঁচে থাকার নতুন সাহস।
সমাজের সহায়তা পেলে হয়তো তার ছোট ব্যবসাটিই হতে পারে পরিবারের জন্য একটু স্বস্তির কারণ। তাই নিজের জন্য বড় কোনো দাবি নয়—শুধু দোকানটি একটু ভালোভাবে পরিচালনার সুযোগ চান হাসান।
হাসান বিশ্বাস সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও বিত্তবান মানুষের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানিয়ে বলেন, কর্মপরিবেশ, দোকানের পুঁজি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে তিনি নিজের ব্যবসা আরও ভালোভাবে চালিয়ে যেতে পারবেন বলে আশা করছেন।
হাসানের সন্তান বলেন, “বাবা অনেক কষ্ট করেন। দুর্ঘটনার পর থেকে বাবাকে এভাবেই দেখে আসছি। বাবার চলাফেরা করতে কষ্ট হয়, অনেক কাজেই আমাদের সাহায্য করতে হয়। তারপরও বাবা কখনো ভিক্ষা করতে চাননি। নিজের মতো করে কিছু করতে চান। এই দোকানটা বাবার কাছে শুধু দোকান নয়, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটা চেষ্টা।”
পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়েও হাসানের আত্মসম্মানটুকু এখনো অটুট। তার ছোট্ট দোকানে সাজানো কয়েক প্যাকেট চানাচুর, বিস্কুট আর অন্যান্য সামগ্রী যেন তার জীবনের বড় এক গল্প বলে—শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানুষকে থামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে সবসময় থামাতে পারে না।
হাসান বিশ্বাস বোয়ালমারী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তার ছোট্ট চানাচুর-বিস্কুটের দোকানটি হয়তো বড় কোনো ব্যবসা নয়। কিন্তু তার কাছে এটি স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন, আত্মসম্মান ধরে রাখার লড়াই এবং পরিবারের জন্য কিছু করার শেষ আশ্রয়।
কেকে/ এমএস