অভাব-অনটনের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্নে ভিটেমাটি বিক্রি করে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন রফিকুল ইসলাম (৪৫)। কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘোরা তো দূরের কথা, কথিত দালালদের খপ্পরে পড়ে একে একে হারিয়েছেন শেষ সম্বলটুকুও। শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে অসুস্থ অবস্থায় মারা গেছেন তিনি—এমন অভিযোগ করেছে তার পরিবার।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টার দিকে রফিকুলের মরদেহ বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খামারকান্দি ইউনিয়নের ফারাজীপাড়া গ্রামে পৌঁছালে কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। এক ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীকে রেখে গেছেন তিনি। স্বজনের মৃত্যুতে পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। রফিকুল ইসলাম ওই গ্রামের মৃত ইউসুফ আলীর ছেলে।
নিহতের ছেলে শাহরিয়ার নাফিস, পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সংসারের দারিদ্র্য দূর করতে জমি বিক্রি এবং চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রফিকুল। একই গ্রামের নাসিমা খাতুন, তার স্বামী সাইফুল ইসলাম, মেয়ে সোনিয়া আক্তার ও মেয়ের জামাই মুসা তাকে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠান বলে অভিযোগ পরিবারের।
তবে সেখানে যাওয়ার পর রফিকুল জানতে পারেন, তাকে আকামা বা ওয়ার্ক পারমিটে নয়, তিন মাসের ট্যুরিস্ট ভিসায় পাঠানো হয়েছে। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে মালয়েশিয়ায় পুলিশের ভয়ে দিনের পর দিন আত্মগোপনে থাকতে হয় তাকে।
পরিবারের অভিযোগ, এ অবস্থায় অভিযুক্ত নাসিমা খাতুন ও তার জামাই মুসার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে রফিকুলের পরিবারের কাছ থেকে আরও ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নেন। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরও তাকে কোনো চাকরি দেওয়া হয়নি।
উল্টো রফিকুলের পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কেড়ে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। দিনের পর দিন নির্যাতনের কারণে অসুস্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় তার মৃত্যু হয়। পরে পরিবারের প্রচেষ্টায় তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
শুক্রবার সকালে রফিকুলের মরদেহ গ্রামে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে অভিযুক্ত দালাল পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে তালা দিয়ে চলে যান বলে স্থানীয়রা জানান।
রফিকুলের স্ত্রী স্বপ্না খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমগোর শেষ সম্বল জমিটুকু বেইচা আর ঋণ কইরা টাকা দিছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমার জামাইটারে দালালরা মিছা কথা বইলা নিয়া মাইরা ফেললো। এখন আমি এই দুইডা এতিম ছাওয়াল-মিয়া নিয়া কোনহানে দাঁড়ামু?”
ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা অবিলম্বে অভিযুক্ত নাসিমা খাতুন, সাইফুল ইসলাম, সোনিয়া আক্তার ও মুসাকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্তদের বাড়িতে গেলে তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মঈনুদ্দীন বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কেকে/সাশ