শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬,
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● সেপ্টেম্বরে ৩ শতাংশ বাড়ল রেমিট্যান্স      ● সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের ৪ মদের গুদাম সিলগালা      ● বাংলাদেশকে ৯ গোল দিয়ে আসিয়ান কাপের ফাইনালে ইন্দোনেশিয়া      ● স্বৈরাচার-গুপ্ত দল আবার এক হয়েছে : প্রধানমন্ত্রী      ● যাত্রা শুরু করল বিশেষায়িত ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’      ● ডেঙ্গুতে আরও চারজনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৯৭৮      ● হামে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১২১৪      
সাহিত্য
আসাদ চৌধুরীর কবিতা: প্রকৃতি ও জীবনবোধের সন্ধানে
মীন চন্দ্র নাথ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫২ পিএম
কবি আসাদ চৌধুরী

কবি আসাদ চৌধুরী

ষাটের দশকের বাংলাদেশের কবিতা বলতে অনেকে বোঝেন ক্ষোভ, অস্থিরতা আর উচ্চকিত প্রতিবাদ। সেই দশকের কবি আসাদ চৌধুরী (জন্ম ১৯৪৩) কিন্তু ভিন্ন পথের পথিক। তিনি চিৎকার করে নয়, ধীর স্বরে কথা বলেছেন। তার কবিতায় ক্রোধের চেয়ে মমতা বেশি, বিশৃঙ্খলার বদলে আছে স্থিরতা। অবক্ষয়, হতাশা ও জীবনসংকটকে তিনি অস্বীকার করেননি। কিন্তু সেখানেই থেমে না থেকে জীবনের অর্থ খুঁজেছেন। সেই খোঁজই তার কবিতার জীবনবোধ।

কবিতা ছাড়াও তিনি শিশুতোষ গ্রন্থ, ছড়া, জীবনী ও অনুবাদ লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন ‘যে পারে পারুক’। তবু কবি হিসেবেই তিনি সবচেয়ে পরিচিত। ‘তবক দেওয়া পান’ (১৯৭৫) থেকে শুরু করে ‘ঘরে ফেরা সোজা নয়’ (২০০৬) পর্যন্ত দীর্ঘ কাব্যযাত্রায় তিনি নিজের স্বর অক্ষুণ্ন রেখেছেন। প্রথম বইতেই পাঠক একটি নতুন অথচ স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর খুঁজে পেয়েছিলেন।

আসাদ চৌধুরী একইসঙ্গে প্রকৃতিপ্রেমিক ও মানবপ্রেমী। তার কবিতায় এই দুটি অনুভূতি আলাদা থাকে না, মিলেমিশে একটি অখণ্ড ভালোবাসা হয়ে ওঠে। ‘জানাজানি’ কবিতা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের পাখি কেন মধুর সুরে ডাকে, আকাশ কেন কপালে টিপ আঁকে, কবি তার উত্তর দেন এক সহজ সত্যে। বাঙালি পাখির ভাষার মান দিতে জানে, উদার আকাশের ইশারা বুঝতে জানে। তাই পাখি গান গেয়ে মুগ্ধ করে, আকাশ টিপ পরিয়ে দেয়। এখানে প্রকৃতি কেবল দৃশ্যপট নয়। সে মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের এক জীবন্ত অংশীদার। দেশ, মাটি ও মাতৃকার প্রতি কবির নৈবেদ্য তাই প্রকৃতির প্রতি নৈবেদ্যও।

এই ভালোবাসা শুধু আবেগসর্বস্ব নয়। যে জাতি পাখির গান আর আকাশের ইশারা বোঝে, সেই জাতিই দেশকে ভালোবেসে দখলদারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। কবির কাছে স্বাধীনতার মূলে ছিল দেশ ও মানুষের প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা।

আসাদ চৌধুরীর জীবনবোধের কেন্দ্রে আছে সত্যের সন্ধান। ‘সত্য ফেরারী’ কবিতায় তিনি প্রশ্ন তোলেন, সত্য কোথায় পালালো? দুধের বোতল থেকে আয়রন সেফ, সংবাদিকের ডেস্ক থেকে ব্যাংক, সর্বত্র খুঁজে তিনি তাকে পান না। গৃহস্থালির তুচ্ছ বস্তুর সারি দিয়ে শুরু হয়ে কবিতা ক্রমে শিল্প, শাসন, প্রেম, আশা ও কালোবাজার পর্যন্ত পৌঁছায়। এই বিন্যাসের মধ্যে একটি তীক্ষè ব্যঙ্গ লুকানো আছে। যে সমাজে সত্য কেবল কবিতা বা ভাষণে নয়, সিলেবাসে আর বোনাসেও অনুপস্থিত, সেখানে নৈতিক শূন্যতা কতা গভীর, কবিতা তারই ইঙ্গিত দেয়।

তবে এ কবিতা কেবল হাহাকার নয়। প্রশ্ন করা মানেই খোঁজা, আর খোঁজার মধ্যেই আশা বেঁচে থাকে। কবির আক্ষেপের নিচে সত্যের প্রতি অটত আস্থা কাজ করে। এখানেই তিনি পলায়নবাদী নন। অবক্ষয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি জীবনের মানে খুঁজে ফেরেন।

মুক্তিযুদ্ধ আসাদ চৌধুরীর কবিতার আরেকটি প্রধান উপাদান। ‘তখন সত্যি মানুষ ছিলাম’ কবিতায় ছোট ছোট চরণে যুদ্ধকালীন দেশের ছবি ফুটে ওঠে। নদীর জলে, বৃষ্টিতে, গানে, কাব্যে, এমনকি বীরাঙ্গনার উদাস দৃষ্টিতেও তখন আগুন ছিল। এই আগুন একই সঙ্গে ক্ষোভের, প্রতিরোধের ও প্রাণের। কুকুর-বেড়াল থাবা তোলে, সাপ ফণা তোলে, শিং মাছ রুখে দাঁড়ায়। যুদ্ধের সময় প্রতিটি প্রাণই যেন প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিল। শেষে কবি স্বীকার করেন, সেসব এখন দূরের গল্প। তখন তিনি সত্যি মানুষ ছিলেন, এখন আছেন অল্প। এই স্বীকারোক্তিতে একটি জাতির আত্মসমালোচনা ও বেদনা মিশে আছে।

‘শহীদদের প্রতি’ কবিতায় তিনি প্রশ্ন করেন, শহীদদের যা বলার ছিল, বাংলাদেশ কি তা বলছে? বাতাসের মতো, নদীর বাঁকা স্রোতের মতো তারা মিলিয়ে গেছেন। কিন্তু বারুদের গন্ধস্মৃতি ফুলের গন্ধকে হারিয়ে দেয়। আর ‘বারবারা বিডলারকে’ কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ আন্তর্জাতিক বিবেকের কাছে আবেদন হয়ে ওঠে। কবি এক পশ্চিমা তরুণীকে ডাকেন নির্যাতিত বাংলাদেশকে চোখ মেলে দেখতে। এই কবিতার ভাষা অপেক্ষাকৃত প্রত্যক্ষ ও আবেগদীপ্ত। এতে বোঝা যায়, শান্ত স্বভাবের এই কবি প্রয়োজনে বজ্রের মতো উচ্চারণও করতে জানেন।

আসাদ চৌধুরীর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য সারল্য। সহজ ভাষায়, অল্প শব্দে তিনি ভাবকে মুক্তি দেন। তাই তার কবিতা পাঠককে বিব্রত করে না, কাছে টানে। কিন্তু এই সরলতা অগভীরতা নয়। একই কবিতার বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা সম্ভব। সমাজ ও সময়কে তিনি শুধু মূল্যায়ন করেন না, তার বৈপরীত্যও তুলে ধরেন।

রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করে আধুনিকতা অর্জনের যে প্রবণতা ত্রিশের দশক থেকে চলে আসছিল, আসাদ চৌধুরী সেই পথে হাঁটেননি। তিনি রবীন্দ্রপ্রভাবকে স্বীকার করেছেন, আত্মস্থ করেছেন। তাই তার শব্দ, উপমা ও বর্ণনায় বারবার রাবীন্দ্রিক আবহ ফিরে আসে। এই গ্রহণ ও আত্মীকরণই তাকে সমকালীন কবিদের মধ্যে ব্যতিক্রমী করেছে।

আসাদ চৌধুরী আমাদের শেখান, অবক্ষয়ের মধ্যেও সম্ভাবনার কথা বলা যায়। জীবন থমকে গেলেও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। তার কবিতায় মানুষ, প্রকৃতি, ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, হতাশা ও আশাবাদ, কোনো কিছুই বাদ পড়েনি। আবার সবকিছুর কেন্দ্রে আছে মানুষের বস্তুগত অবস্থান, তার সংকট ও সংগ্রাম। এই কারণেই তার কবিতা একান্ত ব্যক্তিআশ্রয়ী না হয়ে সমাজজীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

সময়ের প্রভাব-বলয় থেকে বেরিয়ে এসে কবিতাকে কবিতা হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করেছেন বলে তিনি স্বকালের যেমন, উত্তরকালেরও তেমনই আদরণীয় কবি। লোকজ সংস্কৃতি, মাটি ও মানুষের কথা বলে তিনি বাংলার ঘরে ঘরে যে আলো জ্বেলেছেন, শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাসে তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close