বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে উঠেছে, আগস্টে যা ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। জুলাই ও আগস্টে কিছুটা স্বস্তির পর এই ঊর্ধ্বগতি উদ্বেগজনক। এই উদ্বেগের কেন্দ্রে আছে আয় ও ব্যয়ের অসম দৌড়।
একই সময়ে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবীদের মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশে নেমেছে। কৃষি, শিল্প ও সেবা, তিনটি প্রধান খাতেই মজুরি বৃদ্ধির হার কমেছে। অর্থাৎ জিনিসপত্রের দাম যে গতিতে বাড়ছে, মজুরি সেই গতিতে বাড়ছে না। ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ, যা এক বছরের হিসাবেও মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর সরল অর্থ, মানুষের প্রকৃত আয় কমছে।
খাদ্যের দাম এই চাপের সবচেয়ে বড় নিম্ন আয়ের পরিবার তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্যে ব্যয় করে, ফলে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিম ও সবজির দাম বাড়লে তাদের ওপর আঘাত পড়ে সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, অনেক পরিবার পুষ্টিকর খাবার কমাতে, মাছ-মাংস-ডিম বাদ দিতে বা সস্তা বিকল্পে ঝুঁকতে বাধ্য হবে। এর মূল্য শুধু বর্তমানের নয়; শিশুর বেড়ে ওঠা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
খাদ্যবহির্ভূত খাতের চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। এ খাতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা খাদ্য খাতের চেয়ে অনেক বেশি। রেস্তোরাঁ ও হোটেল খাতে ১৩ দশমিক ২৬ শতাংশ, পোশাক ও জুতায় ১০ দশমিক ৩১ শতাংশ, বাসস্থান, পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসে ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং পরিবহনে ৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ। গ্রামে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ, শহরে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ চাপ থেকে কেউই মুক্ত নয়, গ্রামের মানুষের ওপর তা কিছুটা বেশি।
সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু যাতায়াতে সীমাবদ্ধ থাকে না; কৃষিপণ্য ও শিল্পপণ্যের পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে, আর শেষ পর্যন্ত তা পণ্যের দামে গিয়ে পড়ে। শহরের নিম্ন আয়ের কর্মজীবীর জন্য বাস, লেগুনা বা রিকশার ভাড়া বাড়া মানে মাসের শেষে হাতে থাকা টাকা আরও কমে যাওয়া। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির পূর্ণ প্রভাব এখনো বাজারে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি বলেই আগামী মাসগুলোর জন্য সতর্কতা জরুরি।
আয় যখন ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না, তখন মানুষ ধারদেনা করে সংসার চালায়, নয়তো খাদ্য, পোশাক, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের দায়িত্ব শুধু সংখ্যা প্রকাশ বা আশ্বাস দেওয়ায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এ প্রেক্ষাপটে
আমরা কয়েকটি পদক্ষেপের প্রস্তাব করছি:
বাজার তদারকি জোরদার করা। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে অযৌক্তিক মুনাফা ও সিন্ডিকেটের কারসাজি রোধে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে নিয়মিত ও কার্যকর অভিযান চালাতে হবে। জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ে সতর্কতা। তেলের দাম পুনর্নির্ধারণের আগে তার দ্বিতীয় স্তরের প্রভাব, বিশেষ করে পরিবহন ভাড়া ও পণ্য সরবরাহ ব্যয়ে, বিশ্লেষণ করতে হবে।
গণপরিবহনের ভাড়া যাতে অন্যায্যভাবে না বাড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ। নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য ওএমএস, খাদ্য সহায়তা ও টিসিবির কার্যক্রম বাড়াতে হবে এবং সুবিধাভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। মজুরি পুনর্বিবেচনা। শ্রমজীবীদের মজুরি যাতে অন্তত মূল্যস্ফীতির সমান হারে বাড়ে, সে জন্য কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।
মূল্যস্ফীতি কমানো একদিনের কাজ নয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে সরকারের দৃশ্যমান ও দ্রুত পদক্ষেপ এখনই প্রয়োজন। যে অর্থনীতিতে আয়ের চেয়ে ব্যয় দ্রুত বাড়ে, সেখানে প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। সেই বাস্তবতা বদলাতে হলে নীতিনির্ধারকদের নজর রাখতে হবে মানুষের জীবনমানের দিকে, পরিসংখ্যানের খাতায় নয়।
কেকে/ এমএস