নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নেওয়া এ সিদ্ধান্তের ফলে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়ে আইসিসি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তির ওপর আঘাত। আদালতকে সুরক্ষা দিতে এর ১২৫টি সদস্যদেশের প্রতি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।
এক বিবৃতিতে আইসিসি জানায়, এই প্রতিষ্ঠানকে একা লড়াই করতে দেওয়া যায় না। আদালত প্রতিষ্ঠায় যেসব রাষ্ট্র ভূমিকা রেখেছে, তার ভবিষ্যৎ এখন তাদের হাতেও নির্ভর করছে। বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান রক্ষার নয়, বরং আইনের শাসনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সুরক্ষার প্রশ্ন।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসিসি যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার করে থাকে। আদালতটির কার্যক্রম নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধ দীর্ঘদিনের। এর আগে আদালতের কয়েকজন কৌঁসুলি ও বিচারকের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ওয়াশিংটন। তবে এবার আদালতের নিজস্ব কার্যক্রম এবং এর সঙ্গে যুক্ত সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিচার করার সুযোগ আইসিসিকে কখনোই দেবেন না প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আদালতটির সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ করে এর সম্পদপ্রাপ্তি ও কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা সীমিত করাই নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য।
যুক্তরাষ্ট্র শুরুতে আইসিসি প্রতিষ্ঠার রোম সংবিধিতে স্বাক্ষর করলেও পরে তা অনুসমর্থন করেনি।
নিষেধাজ্ঞায় ছয় মাসের ছাড়
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের একটি ছাড়ের সময়সীমা ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া টেলিযোগাযোগ, সফটওয়্যার, পেনশন পরিশোধ এবং আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু লেনদেনের ক্ষেত্রে ছাড় রাখা হয়েছে।
রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ নিরসনে আইসিসি ও এর সদস্যদেশগুলোকে সুযোগ দিতেই নিষেধাজ্ঞার কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। দাবি পূরণ না হলে নিষেধাজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হতে পারে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের কারণে ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে আইসিসির সমালোচনা করে আসছে। তবে আফগানিস্তান-সংক্রান্ত তদন্তকে অগ্রাধিকারের তালিকায় নিচে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে আদালত।
আইসিসির উপপ্রধান কৌঁসুলি নাজহাত শামীম খান রয়টার্সকে বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের শাসন এবং একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কাজ বাধাগ্রস্ত করতেই এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আদালতের বিভিন্ন পরিস্থিতি, তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ছয় মাসের ছাড়ের সময়সীমা আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে আইসিসির গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ইউরোপীয় ইউনিয়নের রয়েছে। অন্যদিকে, আদালতকে সুরক্ষা দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্লকিং স্ট্যাটিউট কার্যকরের আহ্বান জানিয়েছেন বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
৭০ জনের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে পরোয়ানা
আইসিসি বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত ও আন্তর্জাতিক অপরাধের ঘটনায় ৭০ জনের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু, হামাসের কয়েকজন নেতা, সুদানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির এবং লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি।
কেনিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো এবং দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াট্টার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ অবশ্য প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশকে আইসিসি থেকে সরে আসার আহ্বান জানালেও আদালতটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্যদেশসহ অধিকাংশ সদস্যের সমর্থন পেয়ে আসছে। ন্যাটোর সদস্যদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ছাড়া অন্য দেশগুলোও আইসিসির সদস্য। আদালতটির সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসে।
নোবেল কমিটির বার্তায় আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার প্রসঙ্গ
আইসিসির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাইকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। তিনি ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আইসিসির আপিল চেম্বারে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নোবেল কমিটি জানায়, আন্তর্জাতিক আইনের বিচারক ও প্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে, তখন আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানানোও এ পুরস্কারের একটি উদ্দেশ্য। যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাকে শান্তিপূর্ণ বিশ্বের পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে কমিটি।
সাধারণত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম সীমিত হয়ে যায়। এর ফলে ব্যাংক হিসাব বন্ধ, বিমা সুরক্ষা প্রত্যাহার এবং সফটওয়্যার সেবা বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলায় আইসিসি কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এর অংশ হিসেবে আদালতের কার্যালয়ের কম্পিউটারে মাইক্রোসফটের সফটওয়্যারের পরিবর্তে উন্মুক্ত উৎসের বিকল্প ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্যবিমা সেবা সচল রাখার জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির কাজ চলছে।
সূত্র: রয়টার্স
কেকে/সাশ