মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. সিনথিয়া তাসমিনকে বদলি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ন্যস্ত করা হয়েছে। রোববার (১১ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমীর স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এ আদেশ দেওয়া হয়। তার দায়িত্ব পালন, হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য অধিকার আইনে চাওয়া তথ্যের পূর্ণাঙ্গ জবাব না পাওয়ার অভিযোগের মধ্যে এ বদলির ঘটনা ঘটল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের লিখিত অনুমোদন ছাড়াই মেডিকেল অফিসারের কক্ষের মূল নকশা ও প্রবেশদ্বার পরিবর্তন করা হয়। এছাড়া বহির্বিভাগের টিকিটের ফি আকস্মিক ৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা করা হলেও তীব্র প্রতিবাদের মুখে তা প্রত্যাহার করা হয়। সরকারি বাসভবনে বহিরাগতদের যাতায়াত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নিয়েও এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, বদলির পাশাপাশি উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সরকারি অর্থের ব্যবহার ও হাসপাতালের সেবার মান সম্পর্কে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আদেশ জারির পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তাকে বর্তমান কর্মস্থলের দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে দায়িত্ব হস্তান্তর না করলে ষষ্ঠ কর্মদিবস থেকে তাকে সরাসরি অবমুক্ত বলে গণ্য করা হবে। পরবর্তী পদায়ন করা কর্মস্থলে যোগদান না করলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
১১ বিষয়ে তথ্য চেয়ে আবেদন, পূর্ণাঙ্গ জবাব না পাওয়ার অভিযোগ :
শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা যাচাইয়ে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯’-এর আওতায় ১১টি বিষয়ে তথ্য চেয়ে আবেদন করেছিলেন দৈনিক খোলা কাগজের মৌলভীবাজারের নিজস্ব প্রতিবেদক মো. এহসানুল হক।
আবেদনপত্রের অনুলিপি অনুযায়ী, গত ১০ সেপ্টেম্বর তিনি নির্ধারিত ফরমে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ে আবেদন জমা দেন। এতে বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ, প্যাথলজি ও ভর্তি রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা ফি এবং সরকারি কোষাগারে অর্থ জমার চালানের অনুলিপি চাওয়া হয়।
এছাড়া ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়, দরপত্র ও কার্যাদেশ, জেনারেটর ও অ্যাম্বুলেন্সের জ্বালানি খরচ, সেবা গ্রহণকারী রোগীর হিসাব, সরকারি কোয়ার্টারের বাড়িভাড়া জমা, কর্মকর্তার ছুটির তথ্য, তিন বছরের বেশি সময় ধরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা এবং আইপিএস ও ব্যাটারি চুরির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন চাওয়া হয়।
আবেদনকারীর অভিযোগ, গত ৪ অক্টোবর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ই-মেইলে একটি জবাব দিলেও তাতে চাওয়া ১১টি বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ ও স্পষ্ট তথ্য ছিল না। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে পুনরায় ই-মেইল করা হলেও ১১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রত্যাশিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সরকারি অর্থের ব্যবহার, হাসপাতালের আয়-ব্যয় ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার স্বার্থে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি গাড়ি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন :
সিনথিয়া তাসমিন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শ্রীমঙ্গলে যোগদানের পর সরকারি গাড়ির ব্যবহার, কর্মস্থলে উপস্থিতি ও হাসপাতালের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে।
গত ১ অক্টোবর শ্রীমঙ্গলের সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষে মোজাহিদুল ইসলামের স্বাক্ষরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা হয়। স্মারকলিপিতে সরকারি গাড়ির ব্যবহার, কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতি, সরকারি বাসভবনে বহিরাগত ব্যক্তির যাতায়াত এবং হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
স্মারকলিপিতে হাসপাতাল ও সরকারি বাসভবন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ, তদন্ত চলাকালে তাঁকে অন্যত্র বদলি এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এছাড়া হাসপাতালের জরুরি বিভাগ সংলগ্ন মেডিকেল অফিসারের প্রবেশপথ ও অবকাঠামোগত পরিবর্তন এবং বহির্বিভাগের টিকিটের ফি ৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নথিপত্রের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা দরকার।
চিকিৎসাসেবা, ওষুধ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ :
শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবা, মেডিকেল অফিসারের কক্ষের প্রবেশপথ পরিবর্তন, ওষুধ সরবরাহ ও রোগীদের নিরাপত্তা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ চলে গেলে আইপিএস ও জেনারেটর সচল না থাকায় জরুরি বিভাগে মোমবাতি জ্বালিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। জলাতঙ্কের টিকার সংকট, ওষুধ সরবরাহে অনিয়ম এবং হাসপাতাল প্রাঙ্গণে রোগীদের অর্থ ও স্বর্ণালংকার চুরি এবং কুকুরের উপদ্রবের অভিযোগও উঠেছে।
এসব বিষয়ে ওষুধের মজুত রেজিস্টার, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ নথি, বিদ্যুৎ সরবরাহের তথ্য, নিরাপত্তাসংক্রান্ত অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা।
তাদের মতে, হাসপাতালের সেবার মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
রোগীদের খাবার সরবরাহ ও জাতীয় পতাকা নিয়ে আগের অভিযোগ :
এর আগে গত ৩১ মে দৈনিক খোলা কাগজে ‘রোগীদের খাবারে অনিয়ম ও ২৬ মার্চ রাতেও উড়ে জাতীয় পতাকা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের খাবার সরবরাহে অনিয়ম এবং রাতে জাতীয় পতাকা নামানো না হওয়ার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল। ওই ঘটনার পর জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ইবরাহিম খলিল এবং খাবার সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তুলি এন্টারপ্রাইজকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নোটিশ দেওয়ার পরও দৃশ্যমান কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে হাসপাতালের শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। তবে এ বিষয়ে পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
নকশা বদল ও একক সিদ্ধান্ত : সিভিল সার্জন কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের লিখিত অনুমোদন ছাড়াই মেডিকেল অফিসারের কক্ষে মূল নকশা ও প্রবেশদ্বার পরিবর্তন করা হয়। এ বিষয়টি নিয়ে রোগী ও সচেতনমহলে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
পূর্ববর্তী কর্মস্থল নিয়েও অভিযোগ :
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গলে যোগদানের আগে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ডা. সিনথিয়া তাসমিনের বিরুদ্ধে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল।
২০২৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে প্যাথলিজ, এক্সরে, অ্যাম্বুলেন্সের জ্বালানি বিল এবং করোনা ফান্ডের লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে হাসপাতালের ১৫৭ জন স্টাফ সিভিল সার্জন বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন।
অভিযোগগুলোর মধ্যে হাসপাতালের বিভিন্ন খাতের অর্থ ব্যবস্থাপনা, অধস্তন কর্মীদের সঙ্গে আচরণ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ছিল। পরবর্তী কমূরত স্টাফরা কর্মবিরতি পালন করেন। তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ দিকে তিনি কর্মস্থল ছেড়ে ঢাকায় চলে যান এবং পরবর্তীতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ছুটি নেন। সেই সময় স্থানীয় চিকিৎসক ও কর্মচারীরা তাঁকে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরবর্তী ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ও জিডি :
গত ২৬ সেপ্টেম্বর অফিস সময়ে শ্রীমঙ্গলের একটি অভিজাত হোটেলে ডা. সিনথিয়া তাসমিনের সঙ্গে এক যুবকের উপস্থিতির ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আলোচনা তৈরি হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তাঁর সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে বহিরাগত ব্যক্তির যাতায়াত নিয়েও অভিযোগ তোলা হয়।
এ ঘটনায় নিজের মানহানি হয়েছে দাবি করে সাংবাদিক মনজু বিজয় চৌধুরী ও ইসলামী ছাত্র ঐক্যপরিষদ শ্রীমঙ্গলের নেতা মোজাহিদুল ইসলামের নাম উল্লেখ করে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন সিনথিয়া তাসমিন। পাশাপাশি জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি শিরোমে এ সংবাদটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অফিসিয়াল পেজে পোস্ট করেন। এ বিষয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বক্তব্য দেন। সরকারি কর্মকর্তার এমন কাণ্ডে ফেসবুকে নেটিজনরা নানা আলোচনা-সমালোচনা করেন।
বদলির পাশাপাশি তদন্তের দাবি :
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, কেবল বদলির মাধ্যমে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি হয় না। সরকারি অর্থের হিসাব, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়, দরপত্র ও কার্যাদেশ, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা এবং রোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নথিভিত্তিক জবাব প্রয়োজন।
তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্য অধিকার আইনের আওতায় প্রযোজ্য তথ্য সরবরাহ এবং হাসপাতালের সেবার মান যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।
কর্তৃপক্ষ ও অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য :
সিনথিয়া তাসমিন সরকারি গাড়ি ব্যবহারের কথা স্বীকার করে জানান যে, বাইরে যাওয়ার জন্য অন্য গাড়ি না থাকায় তিনি মাঝেমধ্যে এটি ব্যবহার করেন। আনসার সদস্যকে নিরাপত্তার জন্য রাখা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
বাসভবনে বহিরাগত ব্যক্তির যাতায়াত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ‘আমার কিছু বলার নেই’ বলে গণমাধ্যমকর্মীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
তথ্য সরবরাহ ও অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুরে খোলা কাগজের এ প্রতিবেদক হাসপাতালে গিয়ে তাকে পাননি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম এবং মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন (অতিরিক্ত দায়িত্বে) ডা. জাকির হোসেন জানিয়েছেন, প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে অবহেলা, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।
তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তারা জানান
কেকে/এমএ