সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে স্থগিত হওয়ায় রাজধানীর ৯৫টি কেন্দ্রে হাজার হাজার চাকরিপ্রত্যাশী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। ২৪২টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন প্রায় তিন লাখ ১৯ হাজার প্রার্থী। তাদের অনেকে ধারদেনা করে দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। কেন্দ্রে পৌঁছে তারা জানতে পারেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে। কোথাও পরীক্ষা শুরুর মাত্র পাঁচ মিনিট আগে মাইকে স্থগিতের ঘোষণা এসেছে, আবার কোথাও প্রশ্নপত্র বিলির পর ৩০-৪০ মিনিট পরীক্ষা নিয়ে তা বন্ধ করা হয়েছে। এই বিশৃঙ্খলা প্রার্থীদের ক্ষোভ ও হতাশাকে রাস্তায় নামিয়ে এনেছে।
এই ভোগান্তির দায় প্রথমত যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের। আগে এ ধরনের পরীক্ষার প্রশ্ন সাধারণত স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তৈরি হতো। এবার মন্ত্রণালয় নিজেই তা তৈরি করেছে। এতে প্রশ্ন প্রণয়ন, মুদ্রণ ও সংরক্ষণের পুরো শৃঙ্খলা একই কর্তৃপক্ষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, জবাবদিহির কোনো স্তর থাকেনি। ফাঁসের খবর পরীক্ষার দিন সকাল ৯টার দিকেই ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছিল। অথচ কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিট আগে।
অধিদপ্তরের এক পরিচালক স্বীকার করেছেন, সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো প্রশ্নের সঙ্গে যতটুকু প্রকাশ হয়েছে, ততটুকু মিলে গেছে। এই স্বীকারোক্তিই প্রমাণ করে, প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে যারা ছিলেন, তারা চরম অবহেলা দেখিয়েছেন। অভিযোগ ওঠার পর প্রার্থীদের কেন্দ্র পর্যন্ত আসতে দেওয়ার কোনো ব্যাখ্যাও নেই।
প্রশ্নপত্র ফাঁস বাংলাদেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। স্কুল-কলেজের পাবলিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবারই তদন্ত কমিটি হয়েছে, প্রতিশ্রুতি এসেছে, কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক বিচার খুব কমই চোখে পড়েছে। ফলে ফাঁসকারী চক্র সাহস পেয়েছে। এবারের তদন্ত কমিটিকেও তিন কার্যদিবসের সময় দেওয়া হয়েছে। শুধু প্রতিবেদন জমা দেওয়াই যথেষ্ট নয়, প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ করা হবে তার বাস্তবায়নই আসল পরীক্ষা।
এই ঘটনাটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় দেশের বেকারত্বের প্রেক্ষাপটে। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন, কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ সে তুলনায় সীমিত। সরকারি চাকরি তাই অনেকের কাছে ভবিষ্যতের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। একটি পদের জন্য শত শত প্রার্থীর প্রতিযোগিতায় যদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অনিয়ম ঘটে, তবে মেধাবী ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এতে রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থার প্রতি তরুণদের আস্থা ভেঙে পড়ে।
মনে রাখতে হবে জুলাই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল কোটা আন্দোলনকে ঘিরে। হাজার হাজার তরুণ রাস্তায় নেমে এসেছিল চাকরির বাজারে ফেয়ার প্রতিযোগিতা তথা ন্যায্যতা কায়েমের জন্য। সেই ন্যায্যতা বাস্তবে রূপদান করা সরকারেরই দায়িত্ব। ফলে এই পরিস্থিতিতে থেকে উত্তরণে আমরা কয়েকটি পদক্ষেপের সুপারিশ করছি : প্রথমত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দ্রুত প্রকাশ করে জড়িত ও দায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া চলবে না।
নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন, মুদ্রণ ও বিতরণে নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল নজরদারি ও গোপনীয়তার কঠোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ পেলে দ্রুত যাচাই করে প্রার্থীদের আগেই জানানোর কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা (এসএমএস, গণমাধ্যম) চালু করতে হবে। যাতে প্রার্থীদের দুর্ভোগে পড়তে না হয়। দূরদূরান্ত থেকে আসা ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের যাতায়াত ব্যয় বিবেচনায় ক্ষতিপূরণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে আমরা মনে করছি। পুনর্নির্ধারিত পরীক্ষা সম্পূর্ণ নতুন প্রশ্নপত্রে ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা খাতে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে, যাতে তরুণদের সরকারি চাকরির ওপর একমাত্র নির্ভরতা কমে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস শুধু একটি পরীক্ষার ঘটনা নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের বিশ্বাসের প্রশ্ন। সরকার যদি এখনই কঠোর ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ না নেয়, তবে তরুণদের হতাশা আরও গভীর হবে। চাকরিপ্রত্যাশীরা অনুগ্রহ চান না, তারা চান ন্যায্য ও নিরাপদ প্রতিযোগিতার সুযোগ।
কেকে/ এমএস