প্রাচীনকাল থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে সূর্য। নক্ষত্রের বুকে জ্বলন্ত শক্তির যে রহস্য কোটি কোটি বছর ধরেই মহাবিশ্বকে আলোকিত করে চলেছে ঠিক সেই একই নীতিতে পারমাণবিক ফিউশন প্রযুক্তিকে মানুষের হাতের মুঠোয় আনতে এবার যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে চীন। ল্যাবরেটরির গবেষণার গণ্ডি পেরিয়ে কৃত্রিম সূর্য বা পারমাণবিক ফিউশন কর্মসূচির দিকে এগিয়ে চলছে এ প্রকল্পনা।
এ প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয় ২০০৬ সালে, তখন থেকেই ইস্ট নামের একটি পরীক্ষামূলক রিয়েক্টর এর কাজ চলমান। আসল সূর্য যেভাবে হাইড্রোজেন পরমাণুগুলোকে প্রচণ্ড তাপে ও চাপে একত্রিত করে হিলিয়ামে রূপান্তর করে শক্তি তৈরি করে, চীনের এই চুল্লিটিও ঠিক একই পদ্ধতি অনুসরণ করে। পৃথিবীর সূর্যের মতো এত চাপ না থাকায় বিজ্ঞানীরা চুল্লির তাপমাত্রা ১০ থেকে ১৫ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়িয়ে নেন যা আসল সূর্যের চেয়েও প্রায় ৭ থেকে ১০ গুণ বেশি উত্তপ্ত এবং শক্তিশালী চুম্বক ক্ষেত্র দিয়ে সেই উত্তপ্ত প্লাজমাকে ধরে রাখে।
চাইনিজ একাডেমি অফ সাইন্সের ইন্সটিটিউট অফ প্লাজমা ফিজিক্স এ বিশাল ডি আকৃতির ম্যাগনেট তৈরি করেছে। এর দৈর্ঘ্য ২১ মিটার, প্রস্থ ১২ মিটার এবং ওজন প্রায় ৫৮৩ টন। এ ছাড়াও ফিউশন রিঅ্যাক্টরের ভেতরে সূর্যের মতো পরিবেশ তৈরি করতে ১০০ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস এরও বেশি তাপমাত্রার প্লাজমা তৈরি করা হয়েছে। তবে এত উচ্চ তাপমাত্রার প্লাজমা যদি রিঅ্যাক্টরের দেয়ালে পড়ে তাহলে পুরু ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী চুম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে প্লাজমা কে মাঝখানে ভাসমান অবস্থায় নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। নতুন সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজটাই করে থাকে।
একইসঙ্গে গবেষকরা উচ্চ তাপমাত্রার সুপারকন্ডাক্টটিং সেন্ট্রাল সলিনয়েড কয়েল পরীক্ষাও সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। রিয়েক্টরের হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত এই অংশটি প্লাজমাকে প্রজ্বলিত রাখা এবং ফিউশন বিক্রিয়া স্থিতিশীলভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করছেন কিভাবে অত্যন্ত উত্তপ্ত প্লাজমাকে দীর্ঘসময় নিরাপদভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
আর এই গবেষণাতেই চলতি বছরে আসে বড় সাফল্য। ইস্ট টানা ১০৬৬ সেকেন্ড অর্থাৎ প্রায় ১৮ মিনিট প্লাজমা নিয়ন্ত্রণে রেখে নতুন বিশ্ব রেকর্ড করেছে। এ অর্জন প্রকল্পকে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। এই চুম্বক ব্যবহার করা হবে চীনের নতুন প্রজন্মের পিষ্ট ফিউশন রিঅ্যাক্টরে। এর নির্মাণ ২০২৭ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০৩০ সালের দিকে পরীক্ষামূলক ফিউশন শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আশাবাদী দেশটি। কৃত্রিম সূর্যের নাম শুনে মনে হতে পারে এটি হয়তো বাস্তব সূর্যের সমকক্ষ বাস্তবে ব্যাপার টা এমন নয়; এটি এমন একটি পারমাণবিক ফিউশন রিঅ্যাক্টর যেখানে সূর্যের ভেতরে যেভাবে শক্তি উৎপন্ন হয় সেই একই প্রক্রিয়াকে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পুনরায় তৈরি করার চেষ্টা চলছে মাত্র। এটি ভবিষ্যতে পৃথিবীকে সীমাহীন ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ শক্তি জুগিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সাহায্য করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
পৃথিবীর জ্বালানি সংকট চিরতরে দূর করতে এই সূর্য হতে পারে সীমাহীন শক্তির উৎস কারণ এই প্রযুক্তির প্রধান জ্বালানি হলো ডিউটেরিয়াম ও টিট্রিয়াম, যা সরাসরি সমুদ্রের পানি হতে সহজেই পাওয়া সম্ভব। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, মাত্র ১ লিটার সমুদ্রের পানি থেকে যে পরিমাণ ফিউশন শক্তি পাওয়া যাবে তা প্রায় ৩০০ লিটার পেট্রোলের সমান যা পৃথিবীর শক্তির সংকট দূর করবে।
সাধারণ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে এবং ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হয় কিন্তু কৃত্রিম সূর্যের ফিউশন পদ্ধতিতে কোনো দীর্ঘমেয়াদি তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হয় না এবং বিস্ফোরণের কোনো আশঙ্কা নেই। এ ছাড়াও এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো বাণিজ্যিক উপায়ে ফিউশন শক্তি ব্যবহার করে কম খরচে বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। এক কেজি ফিউশন জ্বালানি, কয়লা বা তেলের চেয়ে প্রায় ৪০ লক্ষ গুণ বেশি শক্তি উৎপন্ন করতে পারে যা দিয়ে পুরো পৃথিবীর সাশ্রয়ী মূল্য নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।
নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তিকে মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ জ্বালানি সংকটের সুদূরপ্রসারী এবং স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গবেষকদের মতে এটি ভবিষ্যতের ফিউশন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে এটি শুধুই বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানবসভ্যতা এবং পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। কয়লা, খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত পৃথিবীতে দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। কৃত্রিম সূর্য পুরোপুরি সফল হলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা দূর করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ গ্রিনহাউস গ্যাস মুক্ত হওয়ায় পৃথিবীর ওজোন স্তরের ক্ষয় রোধ করতে সক্ষম।
গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণতা কমে আসার কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ গলা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার মতো বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলো থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করবে। ইস্পাত, কেমিক্যাল ও ভারী শিল্প কারখানাগুলোতে প্রচুর তাপ ও শক্তির প্রয়োজন হয়, কৃত্রিম সূর্যের উচ্চ তাপমাত্রা ও শক্তি ব্যবহার করে পরিবেশ দূষণ ছাড়াই এসব কারখানার কাজ চালানো সম্ভব হবে। কৃত্রিম সূর্যের ফিউশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে এমন রকেট ইঞ্জিন তৈরি করা সম্ভব হবে যা দিয়ে বর্তমানের চেয়ে অনেক দ্রুত মহাকাশে ভ্রমণ করা যাবে। সর্বোপরি, এটি সফল হলে পৃথিবী একটি দূষণমুক্ত ও শক্তির দিক থেকে আত্মনির্ভরশীল গ্রহে পরিণত হবে।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/ এমএস