সম্প্রতি এক আলোচনাসভায় একটি বাক্য শুনে থমকে গিয়েছিলাম। সত্যিকারের বিপ্লবী বয়ান নিয়ে কাজ করেন না, কাজ করেন সত্য নিয়ে। কথাটা খুব সাধারণ শোনাচ্ছে, তাই না? কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আমাদের রাজনৈতিক আলাপের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এর ভেতরে কত বড় অস্বস্তি লুকিয়ে আছে। টক-শো থেকে ফেসবুকের দেওয়াল, সেমিনার থেকে চায়ের দোকান, সবখানে এখন একটাই শব্দ, ন্যারেটিভ। কে কার বয়ান দাঁড় করাবে, কার বয়ান টিকবে, এই প্রতিযোগিতাই যেন রাজনীতি হয়ে উঠেছে।
প্রশ্নটা তাই এড়ানো যায় না। বয়ান তৈরির এই তাড়না কি অভ্যুত্থানের নিজের ভাষা, নাকি পুরোনো ব্যবস্থার রেখে যাওয়া অভ্যাস? ফ্যাসিবাদকে আমরা প্রায়ই আধুনিকতার বাইরের কোনো দানব ভাবি। আসলে ফ্যাসিবাদ আধুনিকতারই উল্টো পিঠ। আধুনিক রাষ্ট্র যে কৌশলে মানুষকে কাউন্ট করে, ভাগ করে, ছবি আর পাঠের ভেতর দিয়ে শাসন করে, ফ্যাসিবাদ সেই কৌশলকেই চরমে নিয়ে যায়। তার প্রধান অস্ত্র লাঠি নয়। গল্প।
বয়ানের ‘পশুরাজ্য’
হেগেল তার ফেনোমেনোলজি অব স্পিরিট গ্রন্থে ‘আধ্যাত্মিক পশুরাজ্য’ নামে এক অদ্ভুত জগতের কথা বলেছিলেন। সেখানে প্রত্যেকে দাবি করে, সে ‘আসল বিষয়ের’ সেবা করছে; অথচ প্রত্যেকে আসলে নিজের খোঁয়াড় পাহারা দেয়। আমাদের বয়ানের জগৎ অনেকটা এমনই। লাকাঁ যাকে প্রতীকী বিন্যাস বা সিম্বলিক অর্ডার বলেছেন, মানুষ সেখানে ইমেজ আর টেক্সটের ভেতর নিজের চরিতার্থতা খোঁজে। এ জগতে মিথ্যাবাদী ও সুবিধাবাদীর সুবিধা বেশি। কারণ, বয়ানের কোনো দায় নেই; সত্যের আছে।
ইতালীয় চিন্তক আন্তোনিও গ্রামসি এই অবস্থাকে আরেক দিক থেকে বুঝতে সাহায্য করেন। তার মতে, শাসকগোষ্ঠী কেবল বলপ্রয়োগে টেকে না, টেকে সম্মতি আদায় করে। শিক্ষা, গণমাধ্যম আর সংস্কৃতি মিলে এমন এক ‘কাণ্ডজ্ঞান’ তৈরি করে, যাকে প্রশ্ন করাই অস্বাভাবিক মনে হয়। দেড় দশকের শাসন টিকে ছিল এই আধিপত্যের ওপর। কোন উচ্চারণ প্রগতিশীল, কোন পোশাক পশ্চাৎপদ, কোন ইতিহাস ‘চেতনার’ আর কোনটা নয়, সবই আগে থেকে ঠিক করে দেওয়া ছিল। জুলাইয়ে এই কাণ্ডজ্ঞানেই প্রথম ফাটল ধরল। ভিন্নমতকে দমনের আগে তাকে একটা নাম দেওয়া হতো, আর সেই নামই ছিল গুলির আগের গুলি। শিক্ষার্থীরা যখন সেই গালিকে উল্টে নিজেদের স্লোগান বানালেন, বোঝা গেল ভাষার ওপর দখল আলগা হতে শুরু করেছে।
ভাষা যার, জাতি তার
আমাদের জাতীয়তাবাদ যেহেতু ভাষাভিত্তিক, ভাষার দখল তাই এখানে সবচেয়ে বড় দখল। এই দখলের ইতিহাস পুরোনো। ১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগ চালু হওয়ার পর পণ্ডিতদের হাতে বাংলা গদ্যের যে মান দাঁড়াল, তাতে তৎসম শব্দ হলো আভিজাত্যের চিহ্ন। আরবি-ফারসি শব্দ, যা শত শত বছর ধরে কৃষকের মুখের ভাষা ছিল, হয়ে গেল ‘বিদেশি’। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন দেখিয়েছিলেন, ছাপাখানা আর প্রমিত ভাষা মিলেই জাতিকে একটি ‘কল্পিত সম্প্রদায়’ হিসেবে গড়ে তোলে। কিন্তু কল্পনার সীমানা টানে কে? যে প্রমিত ভাষা লেখে, সে-ই ঠিক করে কারা ভেতরে থাকবে আর কারা বাইরে।
এ কারণেই ‘বাঙালি মুসলমান’ বললে আজও পাল্টা প্রশ্ন শুনতে হয়, মুসলমান বলার দরকার কী? প্রশ্নটার ভেতরেই উত্তর লুকানো। আমাদের সাংস্কৃতিক কাণ্ডজ্ঞানে বাঙালি পরিচয় আর মুসলমান পরিচয়কে বরাবর মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে, যেন একটি নিলে অন্যটি ছাড়তেই হবে। পরিচয় আর পরিচয়ের রাজনীতি এক জিনিস নয়। যে সংস্কৃতির কোনো সভ্যতাগত বস্তুভিত্তি নেই, তা সহজেই অন্যের হাতের পুতুল হয়। অথচ এ অঞ্চলের ইতিহাসে সুফিরা এসে কৃষককে হাল আর হরফ, দুটোরই ব্যবহার শিখিয়েছিলেন। চর্যাপদের সহজিয়া ধারা থেকে সৈয়দ সুলতানের জ্ঞানচৌতিশা পর্যন্ত ‘সহজ মানুষের’ যে ধারণা বয়ে এসেছে, তা গুটিকয় অভিজাতের গোপন সাধনাকে সাধারণ মানুষের কাছে খুলে দিয়েছিল। এই ইতিহাস পাঠ্যবইয়ে প্রায় নেই। আর মধ্যযুগ মানেই অন্ধকার যুগ, ইউরোপের ইতিহাস থেকে ধার করা এই কালবিভাজন আমরা বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়েছি।
জার্মান দার্শনিক ওয়াল্টার বেনিয়ামিন লিখেছিলেন, সভ্যতার এমন কোনো দলিল নেই, যা একই সঙ্গে বর্বরতারও দলিল নয়। তাই তার পরামর্শ ছিল ইতিহাসকে উল্টো দিক থেকে আঁচড়ানো। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ফরায়েজি আন্দোলন কিংবা বালাকোটের স্মৃতি ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদের কলমে হয়েছে ‘ধর্মান্ধ’ মুসলমানের উপদ্রব। উইলিয়াম হান্টারের বর্ণবাদী গদ্য তার বড় উদাহরণ। বেনিয়ামিন সতর্ক করেছিলেন, শত্রু জিতলে মৃতরাও নিরাপদ থাকেন না। জুলাইয়ের শহীদদের বেলায়ও কথাটা খাটে।
গাইস্ট থেকে লোগোস
এখানে একটি দার্শনিক জট খোলা দরকার। এ অঞ্চলের মানুষের স্পিরিট বা গাইস্ট ইতিহাসে বারবার জেগেছে। ত্রয়োদশ শতকে সুফি ও সহজিয়াদের হাত ধরে, উনিশ শতকের গোড়ায় কৃষকের বিদ্রোহে, আর সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। এই স্পিরিট জাগলে মানুষ আর পুরোনো ব্যবস্থা মানে না। তারও আগে, একাদশ শতকে বরেন্দ্রের কৈবর্ত বিদ্রোহে সেই অস্বীকারের প্রাচীন নজির মেলে; উত্তরবঙ্গের ‘ভীমের জাঙ্গাল’ আজও সেই স্মৃতি বয়ে বেড়ায়। কিন্তু স্পিরিট নিজে বিমূর্ত, অধরা। তাকে ভাষার ভেতর ‘গ্রেপ্তার’ করা না গেলে সে মিলিয়ে যায়। জীবন এলোমেলো, তাকে সংলগ্ন করতে হয় ভাষায়। গাইস্টকে লোগোসে রূপ দেওয়ার এই কাজটাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের আসল কাজ।
হেগেলের প্রভু-দাস দ্বান্দ্বিকতা মনে করিয়ে দেয়, স্বীকৃতি তর্কে আসে না; আসে মরণপণ লড়াইয়ে। সত্যকে কেবল সামনে হাজির করলেই বয়ানের পশুরাজ্য হারে না। জুলাইয়ে মানুষ সেই লড়াই করেছে। হান্না আরেন্টের ভাষায়, রাস্তায় তৈরি হয়েছিল এক ‘আবির্ভাবের পরিসর’। মানুষ একসঙ্গে কথা বলে ও কাজ করে বলেই সেখানে ক্ষমতা জন্মায়, ছড়িয়ে পড়লে মিলিয়ে যায়। হাকিম বে একে হয়তো বলতেন সাময়িক স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। মুশকিল হলো, সাময়িক জিনিস সাময়িকই থাকে। রাস্তার সেই পরিসর যদি পাঠ্যবইয়ে, শ্রেণিকক্ষে, প্রতিষ্ঠানের চর্চায় জায়গা না পায়, তাহলে অভ্যুত্থান একটা স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে থাকবে। ভাষা হয়ে উঠবে না।
আগুন পেরোনো মানুষ
সত্য তাহলে থাকে কোথায়? সত্য গায়েবিভাবে নামে না। সে প্রকাশিত হয় সম্পর্কের ভেতর দিয়ে : মানুষের সঙ্গে মানুষের, খাদ্যের সঙ্গে, প্রাণ ও প্রকৃতির সঙ্গে। হুসার্ল যাকে ‘লেবেনসভেল্ট’ বা যাপিত জগৎ বলেছিলেন, সত্যের ঠিকানা সেখানেই। যারা জুলাইয়ের আগুন পেরিয়ে এসেছেন, তারা আর আগের জীবনে ফিরতে পারেন না। ফিরলে স্খলন অনিবার্য। পুরোনো ফ্যাসিবাদী ভাষায় নতুন রাজনীতি হয় না। সেই ভাষাকে প্রতিদিনের যাপনে অস্বীকার করেই বাঁচতে হবে। আরেন্ট যাকে ‘ন্যাটালিটি’ বলেছেন, নতুন করে শুরু করার সেই মানবিক সামর্থ্যরে পরীক্ষা এখানেই।
উত্তরায় যে তরুণ ‘পানি লাগবে, পানি’ বলে ছুটছিলেন, তার পাশে কে হাঁটছিলেন, সেটা মনে রাখা জরুরি। যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া কিংবা উত্তরায় যারা প্রাণ দিলেন, তাদের নামের তালিকায় নানা ধর্মের, নানা শ্রেণির মানুষ পাশাপাশি। এই পাশাপাশি থাকাটাই সম্পর্ক, সত্যও এখানেই। ঢাকার স্থাপত্যে, নগরের পরিসর-নকশায়, আমাদের স্বপ্ন ও কল্পনায় এই স্পর্শ না থাকলে স্মৃতি দ্রুত ফিকে হবে। স্থপতিরা জানেন, খুব সাধারণ একটা ছাদও কখনো কখনো স্মারক হয়ে ওঠে, যদি তার নিচে ইতিহাস জমে থাকে। নগরের পরিসর গড়া তাই কেবল নকশার প্রশ্ন নয়, স্মৃতিরও প্রশ্ন।
আমরা অধিকাংশই চাষার সন্তান। আমাদের দাদা কিংবা তার বাবা কল্পনাও করেননি, তাদের উত্তরপুরুষ একদিন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে সংস্কৃতি নিয়ে তর্ক করবে। তাদের দীর্ঘশ্বাস আমাদের রক্তে আছে। প্রতিপক্ষের হাতে গোছানো পরিচয় আছে, শত্রু বানানোর দক্ষতা আছে। আমাদের তা নেই, থাকা উচিতও নয়। ফলে নিজেদের শক্তির জায়গাগুলো চিনে নিতে হবে। সে জন্যই কথা বলা দরকার, একে অন্যকে বোঝা দরকার। বয়ান হাওয়ায় ভাসে। সত্যকে মাটিতে নামাতে হয়।
লেখক : শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
কেকে/ এমএস