কড়া নাড়ছে শীত। দিনে গরম সন্ধা হলেই শীতের আগমনী বার্তা, কুয়াশার সঙ্গে শীত অনুভূত হচ্ছে। সকালের শিশির ভেজা ঘাস জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। অনেকেই রাতে ফ্যানের হাওয়া (বাতাস) খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আর যারা ফ্যানের হাওয়া খাচ্ছে তারা কাথা বা পাতলা কম্বল ব্যবহার করছে। আর এসবই জানান দিচ্ছে শীত আগমনের বার্তা।
এরই মধ্যে চুয়াডাঙ্গার সীমান্তবর্তী উপজেলার জীবননগরের গাছিরা আগাম খেজুর গাছ তুলতে শুরু করেছে। শীত আসতে না আসতেই উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার গাছিরা আগাম খেজুর গাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছে। কে কত আগে, খেজুর রস সংগ্রহ করতে পারে, সেই প্রতিযোগিতায় চলছে জীবননগর গাছিদের মাঝে।
খেজুর গাছ থেকে বিশেষভাবে রস সংগ্রহ করতে পারদর্শী তাদের গাছি বলা হয়। শীতের মৌসুম শুরু হতে না হতেই আগাম রস পাওয়ার আশায় অধিকাংশ এলাকার গাছিরা গাছের পরিচর্যা ও গাছ প্রস্তুত করতে শুরু করেছে। গাছিরা হাতে দা নিয়ে ও কোমরে ডোঙ্গা বেঁধে নিপুণ হাতে গাছ চাছাছোলা করছেন।
শীতের মৌসুম মানেই খেজুর গুড়ের মৌ মৌ গন্ধে ভরে ওঠে পুরো পাড়া মহল্লা। আর শীতের সকালে ঠান্ডা খেজুর রসের তৃপ্তি-ই আলাদা। এ ছাড়া খেজুর রসের ক্ষীর পায়েসের মজাই না-ই বা বলা হলো। প্রতিদিন গ্রামের কোনো না কোনো বাড়িতে খেজুর রসের খবারের আয়োজন চলে। খেজুরের শুধু রসই নয়, পাটালি, নলেন গুড় ছাড়া জমেই না।
ধারালো দা দিয়ে খেজুর গাছের সোনালি অংশ বের করা হয়, যাকে বলে চাঁচ দেওয়া তার সপ্তাহ খানেক পর বাঁশের তৈরি নোলন স্থাপনের মাধ্যমে শুরু হবে সুস্বাদু খেজুর রস আহরণের কাজ।
জীবননগর উপজেলার প্রতিটি মাঠের ক্ষেতের আইলে, রাস্তার পাশে, পুকুর পাড়ে -অযত্নে অবহেলায় বেড়ে ওঠা খেজুরের গাছ জেলার অর্থনীতিতে আশীর্বাদ। শীত মৌসুমে রস-গুড় উৎপাদন করে প্রায় ৫ থেকে ৬ মাস স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে উপজেলার কয়েক হাজার পরিবার।
খেজুরের রস, গুড় ও পাটালি উৎপাদনে প্রসিদ্ধ উপজেলা জীবননগর। এ উপজেলায় যে রস, গুড় ও পাটালি তৈরি হয়, তা নিয়ে শীত মৌসুমে রীতিমতো কাড়াকাড়ি শুরু হয়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি হয় এ উপজেলার গুড়-পাটালি। দেশের বাইরেও এর বেশ কদর রয়েছে।
শীত মৌসুম খেজুরের রস দিয়ে গ্রামীণ জনপদে শুরু হয় শীতের আমেজ। শীত যত বাড়বে খেজুরের রসের স্বাদ তত বাড়বে। সুস্বাদু পিঠা ও পায়েস তৈরিতে আবহমান কাল থেকে গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে খেজুরের গুড় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখানকার কারিগরদের দানা গুড়, পাটালি গুড় তৈরিতে ব্যাপক সুনাম থাকায় খেজুরের গুড় পাটালির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে দেশজুড়ে।
জীবননগর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের জিলহাজ জানান, ১০ দিন হয়েছে কাজ শুরু করেছি। গাছের ময়লা ও অপ্রয়োজনীয় ডালপালা ছেঁটে ফেলা হয়েছে। ধারালো দা দিয়ে খেজুর গাছের সোনালী অংশ বের করে নলি স্থাপনের কাজও প্রায় শেষ। কিছুদিন পরই গাছে লাগানো হবে মাটির পাতিল। এর পরই শুরু হবে সুস্বাদু খেজুর রস সংগ্রহের কাজ। তা দিয়ে তৈরি হবে গুড় ও পাটালি।
তিনি আরও বলেন, এক কেজি গুড় তৈরি করতে খরচ হয় ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। আর বিক্রি করতে হয় ১৯০-২০০ টাকা দরে। যে কারণে চাষিরা গুড় বানাতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।কিছু অসাধু ব্যবসায়াী বেশি লাভের আশায় গুড়ে চিনি মিশিয়ে আমাদের ক্ষতি করছে।
উপজেলার দেহাটি গ্রামের গাছি লিয়াকত হোসেন জানান, শীতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর রস। আর সপ্তাহ দুইয়েক পর গাছ থেকে রস সংগ্রহের পর্ব শুরু হবে। তার নিজের রয়েছে ৪০টি গাছ। আরও ৪০টি গাছ তিনি বর্গা নিয়েছেন। গাছ একবার ছাঁটলে তিন-চার দিন রস সংগ্রহ করা যায়।
উপজেলার কাটাপোল গ্রামের গাছি আবু তালেব বলেন, বর্তমানে যে হারে খেজুর গাছ হারিয়ে যেতে বসেছে, তাতে এক সময় হয়তো আমাদের দেশে খেজুর গাছ থাকবে না। এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চাইলে আমাদের সবার উচিত তালগাছের মতো বেশি বেশি খেজুর গাছ লাগানো এবং তা যত্ন সহকারে বড় করা।
যাদবপুর গ্রামের ইসমাইল হোসেন বলেন, জীবননগর উপজেলার খেজুর গাছের রস হতে উৎপাদিত গুড় দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রতিবছর গ্রাম থেকে ট্রাক ভর্তি গুড় দেশের বিভিন্ন যায়গায় রপ্তানি হয়ে থাকে।তবে গুড়ে চিনি মিশিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আমাদের সুনাম নষ্ট করছে।তাদের বিরুদ্ধে সরকারের আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
গ্রামবাংলার সেই ঐতিহ্য খেজুর রস ও গুড় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটার কারণে আজ বিলুপ্তির পথে। প্রতিদিন ইটভাটায় জ্বালানির কাজে নিধন হচ্ছে এলাকার শত শত খেজুর গাছ। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এর পরও গাছিরা তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানান, আর মাত্র কয়েকদিন পরই গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হবে। রস থেকে গুড় তৈরির পর্ব শুরু হয়ে চলবে প্রায় ফাল্গুন মাস পর্যন্ত। হেমন্তের প্রথমে বাজারগুলোতে উঠতে শুরু করবে সুস্বাদু খেজুরের পাটালি ও গুড়। স্হানীয়রা আরোও চলতি মৌসুমে ২০০টি খেজুর গাছের রস, গুড়-পাটালি বিক্রয় করে করে খরচ বাদে প্রায় ১ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তারা।
জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, উপজেলাজুড়ে গাছিরা খেজুরের রস আহরণে গাছ প্রস্তুত করছেন। স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে রস ও গুড় উৎপাদনে কৃষি বিভাগ সহযোগিতা করছে। নিপা ভাইরাস এবং চিনি মিশিয়ে অতিরিক্ত দামে গুড় বিক্রির বিরুদ্ধে অসাধু ব্যবসায়ীকে সর্তক করা হচ্ছে।কৃষককে উৎসাহিত করতে সরকারিভাবে প্রকল্প শুরু হয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৬ হাজার ৭শ ৫০টি খেজুরগাছ থেকে ১শ এক মেট্রিক টন গুড় উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। যা থেকে ২কোটি ২লক্ষ ৫০হাজার টাকার গুড় বিক্রির সম্ভবনা রয়েছে। পাশাপাশি রস-গুড়ের পিঠা ও মিষ্টান্ন বিক্রি করেও আর্থিকভাবে লাভবান হন গাছিরা
কেকে/ এমএস