রাজনীতিতে দল ও মতের পার্থক্য থাকলেও মানবিকতার প্রশ্নে সেই বিভেদ যে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না, তার দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায়। প্রয়াত ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. সাইফুল ইসলামের স্ত্রী ঝুমা আক্তারকে স্বাবলম্বী করে তুলতে সেলাই মেশিন উপহার দিয়েছে উপজেলা জামায়াতে ইসলামী। তিন মেয়েকে নিয়ে আর্থিক সংকটে থাকা এ নারীর জীবিকার পথ তৈরি করতেই দলটির এ উদ্যোগ।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকালে উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের উত্তর জামষাইট গ্রামে প্রয়াত সাইফুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রী ঝুমা আক্তারের হাতে সেলাই মেশিনটি তুলে দেন জামায়াতের স্থানীয় নেতারা। এ সময় তারা পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মো. সাইফুল ইসলাম বনগ্রাম ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তিন মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন স্ত্রী ঝুমা আক্তার। পরিবারের ব্যয়ভার বহন ও সন্তানদের লালন-পালন করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাকে। এমন পরিস্থিতিতে তার আয়ের সুযোগ তৈরি করে দিতে সেলাই মেশিন দেওয়ার উদ্যোগ নেয় কটিয়াদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামী।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সেলাইয়ের কাজের মাধ্যমে ঘরে বসেই আয় করতে পারবেন ঝুমা আক্তার। এতে সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি তিন মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়তেও সহায়তা হবে বলে আশা করছেন তারা।
সেলাই মেশিন পেয়ে আবেগাপ্লুত ঝুমা আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামী বিএনপির ওয়ার্ড সভাপতি ছিলেন। আমরা বিএনপির রাজনৈতিক পরিবারের হলেও জামায়াতে ইসলামী আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। আমার তিনটি মেয়ে রয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পর তাদের নিয়ে সংসার চালানো অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন সময়ে এ সেলাই মেশিন আমার পরিবারের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ মেশিনের মাধ্যমে কাজ করে কিছু আয় করতে পারব বলে আশা করছি। এতে সংসারের খরচ চালানো ও মেয়েদের দেখাশোনার ক্ষেত্রে উপকার হবে। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে দলীয় ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়। যারা আমার কঠিন সময়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’
স্থানীয় বাসিন্দা আলাল হোসেন বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে কেউ বিএনপি করেন, কেউ জামায়াতে ইসলামী করেন—এটা যার যার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু একজন মানুষ বিপদে পড়লে তার পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাইফুল ইসলামের স্ত্রী তিন মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। এ অবস্থায় তাকে সেলাই মেশিন দেওয়া একটি ভালো উদ্যোগ। এর মাধ্যমে তিনি নিজের উপার্জনের সুযোগ পাবেন।’
প্রতিবেশী কাদের মিয়া বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর তিন সন্তান নিয়ে সংসার চালানো সহজ নয়। সেলাই মেশিনটি ঝুমা আক্তারের আয়ের একটি মাধ্যম হতে পারে। আমরা চাই, তিনি এ কাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হোন এবং মেয়েদের ভবিষ্যৎ সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারেন।’
স্থানীয় বাসিন্দা মোছা. রহিমা আক্তার বলেন, ‘একজন অসহায় নারীর পাশে দাঁড়ানো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। রাজনৈতিক পরিচয় আলাদা হলেও মানুষের দুঃসময়ে সবাই এগিয়ে এলে সমাজে সম্প্রীতি বাড়বে। শুধু এককালীন সহায়তা নয়, ঝুমা আক্তার যেন নিয়মিত কাজ করে আয় করতে পারেন, সে জন্যও সহযোগিতা করা প্রয়োজন।’
কটিয়াদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘রাজনৈতিক মতাদর্শ যার যার, কিন্তু মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রয়াত বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলামের পরিবারের আর্থিক সংকটের কথা বিবেচনা করে তার স্ত্রীকে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে আমরা সেলাই মেশিন উপহার দিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই, তিনি এ সেলাই মেশিনের মাধ্যমে আয় করে নিজের পরিবার ও তিন মেয়েকে নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারেন। একজন মানুষ যেন নিজের পরিশ্রমে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করে দেওয়াই আমাদের উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে মানুষের প্রয়োজন ও অসহায়ত্বকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’
সেলাই মেশিন হস্তান্তরের সময় উপস্থিত ছিলেন কটিয়াদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা মাহমুদুল হাসান, বনগ্রাম ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি অধ্যাপক মাওলানা আবু ইছা, ইউনিয়ন প্রচার সেক্রেটারি হাফিজুর রহমান, ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি মাওলানা মো. ইদ্রিস আলী, পেশাজীবী ইউনিয়নের সভাপতি মো. কামাল উদ্দিন, সমাজসেবক চেরাগ আলী ও মো. মিজানুর রহমান প্রমুখ।
কেকে/এআই