প্রতিষ্ঠার ৯১ বছর পর অবশেষে সীমানা সম্প্রসারণের পথে এগোচ্ছে মৌলভীবাজারের পর্যটননগরী শ্রীমঙ্গল পৌরসভা। দীর্ঘদিনের দাবি ও অপেক্ষার পর পৌরসভার সীমানা বর্ধিত করে আশপাশের তিন ইউনিয়নের একাধিক মৌজা, গ্রাম ও চা-বাগান এলাকাকে শহর এলাকার অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবে খসড়া গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার।
গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গেজেটে উল্লেখ করা হয়, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ (২০০৯ সালের ৫৮ নং আইন)-এর ৩ ধারা ও ৩(১) উপ-ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রীমঙ্গল উপজেলার সদর, আশিদ্রোন এবং কালিঘাট ইউনিয়নের কয়েকটি মৌজার নির্দিষ্ট দাগকে শহর এলাকা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হলে পৌরসভার আয়তন বর্তমানের ২ দশমিক ৫৮ বর্গকিলোমিটার থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৫২ বর্গকিলোমিটার হবে। জনসংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় এক লাখে। এতে নগরসেবা সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও পরিকল্পিত নগরায়ণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌর-১ শাখা থেকে প্রকাশিত অতিরিক্ত গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে শ্রীমঙ্গল সদর, আশিদ্রোন ও কালিঘাট ইউনিয়নের নির্দিষ্ট মৌজা ও দাগকে শহর এলাকার অন্তর্ভুক্ত করার অভিপ্রায় জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা পজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেছেন বিভাগের যুগ্মসচিব ড. শাহেদ মোস্তফা।
প্রস্তাবিত এলাকার মধ্যে রয়েছে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের রূপসপুর, শ্রীমঙ্গল, ভাড়াউড়া, সুনগইড় ও উত্তরসুর মৌজার নির্দিষ্ট দাগ। আশিদ্রোন ইউনিয়নের সুনগইড় ও রামনগর মৌজার নির্দিষ্ট দাগ এবং কালিঘাট ইউনিয়নের ভুড়ভুড়িয়া টি এস্টেট এলাকার নির্দিষ্ট দাগ। তবে এ সব এলাকার সুনির্দিষ্ট সীমানা ও অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি গেজেটে উল্লিখিত দাগের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে।
আয়তন বাড়েনি, বেড়েছে জনসংখ্যা ও নাগরিক চাহিদা
১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রীমঙ্গল পৌরসভার আয়তন দীর্ঘ ৯১ বছরেও বাড়েনি। মাত্র ২ দশমিক ৫৮ বর্গকিলোমিটারের এ পৌরসভা ২০০২ সালে ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত হলেও সীমানা রয়ে গেছে আগের মতোই। অথচ এ সময়ে শহরের জনসংখ্যা, ব্যবসা-বাণিজ্য, যানবাহন চলাচল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। শহরের সঙ্গে কার্যত একীভূত হয়ে পড়া আশপাশের অনেক এলাকা প্রশাসনিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদের অধীন থাকায় নগরসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠাকালে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার জনসংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডে রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬০০টি হোল্ডিং। নিজস্ব রাজস্ব আয় বছরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। বর্তমান অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২৮ কিলোমিটার সড়ক, ৩৫ কিলোমিটার ড্রেন, ৬৭৫টি স্ট্রিট লাইট ও ২ হাজার ৩০০টি পানির সংযোগ।
সীমিত আয়তনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও নগরসেবার চাপ সামলাতে গিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষকে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে, পৌরসভার সীমানাসংলগ্ন এলাকায় বসবাস করেও অনেক পরিবার পৌরসভার আওতাভুক্ত নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের।
আগেও গেজেট প্রকাশ হয়, বাস্তবায়ন হয়নি
পৌরসভা সূত্র জানায়, শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নতুন নয়। ১৯৮১ সালে এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু নানা কারণে সীমানা সম্প্রসারণ কার্যকর হয়নি।
সর্বশেষ চলতি বছরের ১৫ মার্চ মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান চৌধুরী সীমানা সম্প্রসারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার প্রদান করেন। এমপির ইস্যুকৃত আধা-সরকারি পত্রের (ডিও লেটার) ইতিবাচক প্রক্রিয়ায় স্থানীয় প্রশাসন তৎপরতা জোরদার করে। গত ১৯ জুলাই সম্প্রসারণের প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে তা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর গত ২১ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয় খসড়া গেজেট প্রকাশ করে।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে পৌরসভার আয়তন ২ দশমিক ৫৮ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৫২ বর্গকিলোমিটার হবে। জনসংখ্যা প্রায় এক লাখে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ওয়ার্ডের সংখ্যা বর্তমানের নয়টি থেকে বেড়ে ১২-১৪টি হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সীমানা সম্প্রসারণ হলে পৌরসভার রাজস্ব আহরণের পরিধি বাড়বে। পাশাপাশি নতুন অন্তর্ভুক্ত এলাকায় সড়ক, ড্রেনেজ, পথবাতি, পানি সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নাগরিক সেবা পরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।’
আপত্তি নিষ্পত্তির বিধান ও পরবর্তী পদক্ষেপ
খসড়া গেজেটে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এর ৩ ধারার ৩ উপধারা অনুযায়ী, প্রজ্ঞাপন প্রকাশের তারিখ থেকে অনূর্ধ্ব এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা প্রস্তাবিত এলাকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সরকারের কাছে লিখিত আপত্তি বা মতামত জানাতে পারবেন। আইনের ৩ ধারার ৪ উপধারা অনুযায়ী, উত্থাপিত আপত্তি ও পরামর্শ পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। এরপর প্রশাসনিক শুনানির মাধ্যমে তা নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
প্রত্যাশা উন্নত নগরসেবার
খসড়া গেজেট প্রকাশের খবরে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হলে অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণ, সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়বে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, শুধু সীমানা বাড়ালেই হবে না; নতুন অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোতে পর্যায়ক্রমে কার্যকর পৌরসেবা পৌঁছে দিতে হবে। পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, পানি নিষ্কাশন, সড়ক নির্মাণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন।
পৌর প্রশাসকের বক্তব্য
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমান দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, ‘১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠাকালে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার জনসংখ্যা ছিল মাত্র দুই হাজার, যা বর্তমানে ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে। কিন্তু আয়তন সেই ২.৫৮ বর্গকিলোমিটারে আটকে থাকায় সঠিক নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। সার্বিকভাবে নাগরিক সেবা নিশ্চিত ও সুবিধা সম্প্রসারণের প্রয়োজন থেকেই দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভার সীমানা বাড়ানোর দাবি ছিল। অবশেষে মন্ত্রণালয় থেকে খসড়া গেজেট প্রকাশ হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘খসড়া গেজেট পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো আপত্তির কথা জানা যায়নি।’
আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সরকার চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন সীমানা কার্যকর করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কৃতজ্ঞতা ও দ্রুত চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের দাবি স্থানীয়দের
স্থানীয়রা সীমানা সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ায় মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ মুজিবুর রহমান চৌধুরী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্যে, দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়িত হলে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সামনে নগর ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে নির্ভর করছে খসড়া গেজেটের ওপর আপত্তি নিষ্পত্তি, চূড়ান্ত অনুমোদন এবং নতুন এলাকায় কার্যকর নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার ওপর।
কেকে/এআই