শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী সুরে মুখরিত হয়ে উঠছে ফরিদপুরের জনপদ। শরতের স্নিগ্ধ আকাশ, কাশফুলের দোলা আর উৎসবের আবহে ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি। পূজার আনন্দকে আরও মধুময় করে তুলতে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে বাড়িতে চলছে নানা ধরনের নাড়ু তৈরির ব্যস্ততা। নারকেল নাড়ু, তিলের নাড়ু আর চিনির নাড়ুর মিষ্টি ঘ্রাণে যেন জানান দিচ্ছে, মা দুর্গার আগমনের দিন আর বেশি দূরে নয়।
এ বছর ফরিদপুর জেলায় ৭৮১টি মন্দির ও মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পূজাকে ঘিরে বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, মধুখালী, ভাঙ্গা, সালথা ও নগরকান্দাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে উৎসবের প্রস্তুতি। পূজার কেনাকাটা, ঘর সাজানো আর অতিথি আপ্যায়নের আয়োজনের পাশাপাশি গৃহিণীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন বাহারি স্বাদের নাড়ু তৈরিতে।
বাঙালির উৎসবের সঙ্গে মিষ্টিমুখের সম্পর্ক বহুদিনের। আর দুর্গাপূজায় নাড়ু যেন এক চিরচেনা ঐতিহ্যের নাম। আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিতজন বাড়িতে বেড়াতে এলে তাদের সামনে মিষ্টিমুখের আয়োজন হিসেবে নাড়ু পরিবেশনের রীতি রয়েছে বহু পরিবারে। এই ছোট্ট মিষ্টান্নের মধ্যেই মিশে থাকে আন্তরিকতা, পারিবারিক বন্ধন আর উৎসবের উষ্ণতা।
নারকেল নাড়ু তৈরির প্রস্তুতিতে এখন সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে অনেক বাড়িতে। কেউ বাজার থেকে কিনে আনছেন পাকা, ঝুনা নারকেল, আবার কেউ পরিচিত দোকানির কাছ থেকে সংগ্রহ করছেন প্রয়োজনীয় উপকরণ। নারকেল কুরিয়ে চিনি বা গুড়ের সঙ্গে জ্বাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু নাড়ু। অন্যদিকে তিল ভেজে গুড় কিংবা চিনির সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে তিলের নাড়ু। আর চিনি দিয়ে তৈরি গোলাকার নাড়ুও থাকছে উৎসবের মিষ্টি আয়োজনে।
মধুখালীর গৃহিণী মাধুরী শীল বলেন, “দুর্গাপূজা এলেই বাড়িতে নাড়ু তৈরির আলাদা আনন্দ শুরু হয়। পরিবারের সবাই মিলে নারকেল কোরানো থেকে শুরু করে নাড়ু পাকানোর কাজ করি। আত্মীয়স্বজন এলে নিজের হাতে তৈরি নাড়ু খাওয়াতে ভালো লাগে। এই আয়োজনের মধ্যেই পূজার আনন্দ খুঁজে পাই।”
একই এলাকার লতা রায় বলেন, “পূজার সময় বাড়িতে অতিথি আসেন। তাই আগে থেকেই নারকেল, তিল ও চিনি সংগ্রহ করে রাখি। বাজারের মিষ্টির চেয়ে বাড়িতে তৈরি নাড়ুর স্বাদ আলাদা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য ও ছোটবেলার অনেক স্মৃতি।”
শুধু স্বাদের জন্য নয়, নাড়ু তৈরির এই আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা সংস্কৃতি। মায়েদের হাত ধরে মেয়েরাও শিখছে নাড়ু তৈরির কৌশল। রান্নাঘরের ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে জমে উঠছে গল্প, হাসি আর পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ।
সব মিলিয়ে ফরিদপুরের ঘরে ঘরে এখন দুর্গাপূজার প্রস্তুতির পাশাপাশি চলছে মিষ্টি উৎসবের আয়োজন। ঢাকের বাদ্য বাজার আগেই নারকেল, তিল আর চিনির মিষ্টি ঘ্রাণে পূজার আনন্দ ছড়িয়ে পড়ছে পরিবার থেকে পরিবারে। নাড়ুর প্রতিটি গোলাকার দানায় যেন ধরা দিচ্ছে বাঙালির ঐতিহ্য, ভালোবাসা আর শারদীয় উৎসবের চিরন্তন মাধুর্য।
কেকে/এমএ