গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক রদবদলকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ঘুষ, দুর্নীতি ও দালালদের দৌরাত্ম্য দূর করে ভূমিসেবায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশংসিত সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাহিদুল হকের পদোন্নতিজনিত বদলিতে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আক্ষেপ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, তার বিদায়ের সুযোগে অফিসে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় অসাধু কর্মচারী ও দালালচক্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।
সম্প্রতি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করলে তাদের নিয়মিত বা পর্যায়ক্রমে বদলি করা হবে। এই নিয়মিত বদলির ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট থেকে কাপাসিয়ায় কর্মরত এসিল্যান্ড নাহিদুল হকের বদলির আদেশ চূড়ান্ত হওয়ায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আক্ষেপ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দায়িত্ব পালনের এক বছরের মধ্যে কাপাসিয়া ভূমি অফিসকে ঘুষ ও দালালমুক্ত মডেল অফিসে রূপান্তর করেছিলেন বিদায়ী কর্মকর্তা নাহিদুল হক। নামজারি (মিউটেশন), খতিয়ান সংশোধন কিংবা মিসমোকদ্দমার মতো জটিল কাজে সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয়ে সরকারি নির্ধারিত ফি দিয়ে সেবা পেতে পারেন, সে ব্যবস্থা করেন তিনি।
প্রান্তিক কৃষকদের সহজ ভাষায় ভূমিসংক্রান্ত জটিল আইন বুঝিয়ে দেওয়া, সরাসরি জনগণের অভিযোগ শোনা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কারণে তিনি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, “একজন কর্মকর্তা ন্যায়নীতিবান হলে প্রশাসনিক কাজ যে কত দ্রুত ও জনবান্ধব হতে পারে, নাহিদুল হক তা দেখিয়েছেন। তার বিদায়ে নতুন যিনি আসবেন, তিনি কতটা জনবান্ধব হবেন—তা নিয়ে আমরা শঙ্কায় আছি।”
দায়িত্ব পালনকালে মাঠপর্যায়ের ভূমিসেবা গতিশীল করতে কাপাসিয়া সদর, তরগাঁও ও টোকসহ উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারী রদবদল নিশ্চিত করেন এসিল্যান্ড। সম্প্রতি কাপাসিয়া সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অনিয়ম, অদক্ষতা ও বহিরাগত দালালদের সম্পৃক্ত করার অভিযোগে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়।
এ ছাড়া অনিয়মের দায়ে পার্শ্ববর্তী কালিয়াকৈর ভূমি অফিসের কয়েকজন কর্মচারীকে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক সাময়িক বরখাস্ত করায় কাপাসিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে। প্রশাসনিক কঠোরতাকে সাধুবাদ জানিয়ে তাঁরা বলেন, অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকারের এমন কঠোর পদক্ষেপই কাম্য।
বিদায়ী কর্মকর্তার বদলির খবরে কাপাসিয়া ভূমি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত কিছু কর্মচারী ও দালালচক্রের পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সেবাগ্রহীতা আসাদুল্লাহ মাসুম, শাজাহান শিকদার, কামাল, তুহিন ও আবুল হোসেনসহ অনেকে জানান, “এসিল্যান্ড স্যারের কড়া নজরদারির কারণে আমরা সরাসরি সেবা পেয়েছি। কিন্তু অফিসে এমন কিছু কর্মচারী আছেন, যারা ছয়-সাত বছর ধরে একই স্থানে দায়িত্বে আছেন। বিশেষ করে এসিল্যান্ডের নাজির বা পেশকার মাহবুবের মতো দীর্ঘদিনের পুরোনো কর্মচারীদের অতীত ও বর্তমান ভূমিকা নিয়ে আমাদের মনে চরম ভীতি কাজ করছে।”
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির একজন কর্মচারী একই অফিসে তিন বছরের বেশি—এমনকি ছয়-সাত বছর ধরে কর্মরত থাকেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল।
কাপাসিয়ার সাধারণ মানুষের দাবি, বিদায়ী এসিল্যান্ড নাহিদুল হকের সময় প্রতিষ্ঠিত দুর্নীতিমুক্ত সুশাসনের ধারা যেন অব্যাহত থাকে। একই সঙ্গে ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রযোজ্য বিধিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করে একই কার্যালয়ে বছরের পর বছর কর্মরত পুরোনো ও বিতর্কিত কর্মচারীদের অবিলম্বে বদলি এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ভূমি অফিসকে পুরোপুরি দালালমুক্ত রাখার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
কেকে/ এমএস