জলবায়ু পরিবর্তন, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্নের কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৬ কোটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অন্যদিকে, চরম তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.৫ শতাংশ পয়েন্ট কমছে।
খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি ও সারের বাজারে অস্থিরতা এবং যুদ্ধের প্রভাবে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ও ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সংকট মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রাজস্ব সক্ষমতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), জাতিসংঘ এবং আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকেরা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সপ্তাহব্যাপী বৈঠকের চতুর্থ দিনে অনুষ্ঠিত ‘বিপর্যয়ের মুখে খাদ্য নিরাপত্তা’ বিষয়ক প্যানেল আলোচনায় বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং এসব সংকটের সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব নিয়ে নিজেদের পর্যবেক্ষণ ও করণীয় তুলে ধরেন আলোচকেরা।
খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে বাড়ছে রাজস্বের চাপ
আইএমএফের ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বকে বারবার খাদ্যমূল্যের ধাক্কা মোকাবিলা করতে হয়েছে। যুদ্ধ, বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার সংকট, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং জ্বালানি ও সারের দামের অস্থিরতা খাদ্যবাজারকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের পর চালের দাম ৫০ শতাংশ, গমের দাম ৩৭ শতাংশ এবং সয়াবিনের দাম ২১ শতাংশ বেড়েছে। এল নিনোর তীব্র প্রভাবে নাইজারে বৃষ্টিপাত ১৯৯৫ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়ায় চরম তাপদাহ গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
রদ্রিগো ভালদেসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চরম তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে জিডিপি প্রায় ০.৫ শতাংশ পয়েন্ট কমছে। খাদ্য সংকটের প্রভাব শুধু মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি বা ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সরকারি রাজস্ব ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায়ও এর বড় প্রভাব রয়েছে।
তিনি বলেন, খাদ্যবাজার তেলের বাজারের মতো বৈশ্বিকভাবে সমন্বিত নয়। খাদ্য উৎপাদন স্থানীয় আবহাওয়া ও ফসলের চক্রের ওপর নির্ভরশীল। ফলে খাদ্য সংকটের ধরন ও স্থায়িত্ব জ্বালানি সংকটের চেয়ে আলাদা হতে পারে। তবে এর রাজস্বগত প্রভাব উল্লেখযোগ্য।
চরম তাপদাহের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও সাহেল অঞ্চলে সরকারি রাজস্ব আয় ০.১৫ থেকে ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট কমতে পারে। একই সঙ্গে তীব্র খরার কারণে সাহেল ও পূর্ব আফ্রিকায় সরকারি ব্যয় ৩ থেকে ৪ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সংকট দেখা দেওয়ার পর ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করার পরিবর্তে আগাম প্রস্তুতির ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, ডিজিটাল পরিচয়পত্র, সামাজিক সুরক্ষার জন্য উপযুক্ত জনগোষ্ঠীর নিবন্ধন এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা জরুরি। এতে সংকটের সময় দ্রুত ও কার্যকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হবে।
খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এখন সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি
আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্ক বলেন, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে কেবল সাময়িক মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন পুনরাবৃত্তিমূলক সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজস্বগত ঝুঁকি।
ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং এল নিনোর মতো আবহাওয়াগত বিপর্যয় একই সঙ্গে খাদ্য, জ্বালানি, নৌপরিবহন ও সারের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এসব সংকটের প্রভাব একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
নাইজেল ক্লার্কের মতে, উচ্চ ঋণ, চড়া সুদের হার ও সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার কারণে নিম্ন আয়ের এবং ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব দেশের জন্য একদিকে সংকটের সময় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া, অন্যদিকে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ।
আমদানিনির্ভর সোমালিয়ায় ‘সংকটের পর সংকট’
সোমালিয়ার অর্থমন্ত্রী বিহি এগেহ তার দেশের পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, সোমালিয়া একক কোনো সংকটের মুখোমুখি নয়; বরং ধারাবাহিকভাবে একাধিক সংকটের সম্মিলিত প্রভাব মোকাবিলা করছে। তিনি এই পরিস্থিতিকে ‘ককটেল অব শকস’ বা একাধিক সংকটের মিশ্রণ হিসেবে বর্ণনা করেন।
সোমালিয়ার মোট খাদ্য ব্যবহারের ৭৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন বা ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব দেশটির খাদ্যবাজার ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে দ্রুত পড়ে।
বিহি এগেহ বলেন, ২০২০ সালে ধারাবাহিক খরা, ২০২৪ সালে এল নিনো-সংশ্লিষ্ট বন্যা, ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়া এবং ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব দেশটির অর্থনীতিকে গভীর ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আমদানিনির্ভর খাদ্যব্যবস্থা এবং ধারাবাহিক প্রাকৃতিক ও আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে সোমালিয়ার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
ত্রাণের বদলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ
বুরকিনা ফাসোর অর্থমন্ত্রী আবুবাকার নাকানাবো বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা কেবল কৃষিবিষয়ক সমস্যা নয়। এর সঙ্গে অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা, সরকারি রাজস্ব এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত।
দেশটি বর্তমানে নিরাপত্তা সংকট, জলবায়ুজনিত ধাক্কা এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার মতো আন্তঃসংযুক্ত সমস্যার মুখোমুখি। এ পরিস্থিতিতে শুধু ত্রাণের ওপর নির্ভর না করে জনগণকে নিজেদের খাদ্য উৎপাদনে সক্ষম করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আবুবাকার নাকানাবোর মতে, কৃষকদের সেচ সুবিধা ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাঁরা নিজেরাই খাদ্য উৎপাদন করতে পারেন। একই সঙ্গে খাদ্য সংকটের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বাজেট প্রণয়ন, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
খাদ্য আমদানি ও শরণার্থীর চাপে জিবুতি
জিবুতির অর্থমন্ত্রী ইলিয়াস মুসা দাওয়ালেহ বলেন, প্রায় ১৫ লাখ জনসংখ্যার দেশটি শতভাগ খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যে অবস্থান করায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি জানান, ২০১২-১৩ সালে জিবুতি প্রতিবেশী ইথিওপিয়া ও সুদানে কৃষিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু কোভিড মহামারি, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোও সংকটে পড়ে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চারণভূমি কমে যাওয়ায় প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোতে সংঘাত বাড়ছে। এর ফলে জিবুতিতে শরণার্থীদের আগমনও বাড়ছে। নিজেদের জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ইয়েমেনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শরণার্থীদের খাদ্যের সংস্থান করতে হচ্ছে দেশটিকে।
এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালী ও উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক উত্তেজনা তৈরি হলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার মাধ্যমে খাদ্য সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি খাদ্য পরিবহন ও সরবরাহের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
খাদ্যের ক্রয়ক্ষমতা কমায় বাড়ছে মানবসম্পদ হারানোর ঝুঁকি
জাতিসংঘের পশ্চিম এশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইএসসিডব্লিউএ) নির্বাহী সচিব রোলা দাশতি বলেন, সংস্থাটির ২২টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৯টি সরাসরি সংঘাত বা সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।
তার মতে, খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শুধু খাদ্যের প্রাপ্যতা নয়, মানুষের খাদ্য কেনার সক্ষমতাও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, একটি পুষ্টিকর খাবারের মূল্য প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে।
রোলা দাশতি সতর্ক করে বলেন, খাদ্যের দাম ২০ শতাংশ বাড়লে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ নতুন করে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শিকার হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তিনি খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান। তার মতে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার কাছে খাদ্য পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করতে হবে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন তিনি। খাদ্য সংকটের কারণে শিশুদের পুষ্টি ও শিক্ষা ব্যাহত হলে দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ ও সামাজিক মূলধনের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।
আগাম প্রস্তুতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় গুরুত্ব
প্যানেল আলোচনায় উঠে আসে, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব এখন খাদ্যবাজারের পাশাপাশি সরকারি বাজেট, রাজস্ব আহরণ, সামাজিক সুরক্ষা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়ছে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর, ঋণগ্রস্ত ও নিম্ন আয়ের দেশগুলো একাধিক সংকটের সম্মিলিত চাপে রয়েছে।
আলোচকদের বক্তব্যে সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আগাম সতর্কতা ও তথ্যভান্ডার তৈরি, ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো, কৃষি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ জোরদার এবং সরকারি বাজেটে সম্ভাব্য সংকটের প্রভাব বিবেচনায় রাখা।
সাময়িক ত্রাণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন, সরবরাহ, ক্রয়ক্ষমতা ও আর্থিক সক্ষমতাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
কেকে/ এমএস