একসময় পাড়া-মহল্লার মাঠজুড়ে ছিল শিশু-কিশোরদের কোলাহল। বিকাল হলেই দল বেঁধে খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, দৌড়ঝাঁপ আর নানা ধরনের আনন্দে মেতে উঠত তারা। ২০০০-২০১৫ সালের সময়টাতে শিশু-কিশোরদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল মাঠের খেলাধুলা ও বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্রে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই জায়গা করে নিয়েছে স্মার্টফোন।
বর্তমানে শিশু থেকে শুরু করে তরুণ, এমনকি বিভিন্ন পেশার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যেও স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স (সাবেক টুইটার), অনলাইন গেমসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দীর্ঘ সময় ব্যয় করছেন অনেকে। ফলে সরাসরি কথা বলা, পরিবারকে সময় দেওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা এবং মাঠে খেলাধুলার মতো অভ্যাস অনেকের জীবন থেকে ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
একই জায়গায় চার-পাঁচজন বন্ধু একসঙ্গে বসে আছেন, অথচ কারও সঙ্গে কারও তেমন কথা নেই। প্রত্যেকের চোখ নিজের মুঠোফোনের পর্দায়। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত, কেউ ভিডিও দেখছেন, আবার কেউ অনলাইন গেমে মগ্ন। পাশাপাশি বসেও যেন সবাই আলাদা এক ভার্চুয়াল জগতে বসবাস করছেন।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে শিশু-কিশোরদের স্মার্টফোন ব্যবহার। অনেক স্কুলপড়ুয়া ছেলে-মেয়ের হাতেও এখন ব্যক্তিগত স্মার্টফোন দেখা যায়। পড়াশোনার প্রয়োজন কিংবা বিনোদনের জন্য ফোন ব্যবহার শুরু হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা দীর্ঘ সময়ের অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। এতে পড়াশোনায় মনোযোগ, ঘুম, শারীরিক সক্রিয়তা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শৈশব শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকার সময় নয়; এ সময়েই গড়ে ওঠে শিশুর সামাজিক দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণ, দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার শিক্ষা। মাঠের খেলাধুলা শিশুদের শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি জয়-পরাজয় মেনে নেওয়া, শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও বন্ধুত্বের মূল্য বুঝতে শেখায়। অতিরিক্ত স্ক্রিননির্ভরতা এ সব অভিজ্ঞতার সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে।
তবে স্মার্টফোন নিজেই সমস্যার মূল নয়। শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ ও জ্ঞান অর্জনে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রয়োজন হচ্ছে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির সঙ্গে বাস্তব জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা।
এ ক্ষেত্রে অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের হাতে ফোন তুলে দেওয়ার পাশাপাশি কী দেখছে, কতক্ষণ ব্যবহার করছে এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে খেলার মাঠ সংরক্ষণ, নিয়মিত ক্রীড়া আয়োজন, বই পড়ার অভ্যাস এবং পরিবারে ফোনমুক্ত সময় চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
প্রযুক্তির উন্নয়ন থামানো সম্ভব নয়, আর তা প্রয়োজনও নেই। কিন্তু প্রযুক্তির সুবিধা নিতে গিয়ে যেন আমরা শৈশবের আনন্দ, বন্ধুত্বের উষ্ণতা এবং সামাজিক সম্পর্ক হারিয়ে না ফেলি, সেদিকে সচেতন হওয়া জরুরি।
আজকের শিশু-কিশোররাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—স্মার্টফোনের পর্দায় ডুবে থাকা এ প্রজন্ম বাস্তব জীবনের জন্য কতটা প্রস্তুত হচ্ছে? তাদের হাতে প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু সেই প্রযুক্তি যেন তাদের শৈশব, খেলাধুলা, পড়াশোনা ও মানবিক বিকাশকে গ্রাস করতে না পারে—এ দায়িত্ব আমাদের সবার।
কেকে/এআই