বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষি সেচ কার্যক্রমে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো এবং সেচযন্ত্রের সঠিক পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) উদ্যোগে প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজশাহীতে বিএমডিএর প্রধান কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে ‘সোলার সেচযন্ত্র পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ’ বিষয়ে এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করে প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যন্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন ও এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ। সহযোগিতা করেন সুপার স্টার রিনিউবল এনার্জি লিমিটেড।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম খান। সভাপতিত্ব করেন বিএমডিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও পিএন্ডডি পার্টনার প্রোগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রকৌশলী ড. মো. আবুল কাসেম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নির্বাহী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে সেচ কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হলে কৃষকদের সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে। ফলে বিদ্যুৎতের অভাবে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা কমবে এবং পানির অভাবে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে দূর হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএমডিএর আওতাধীন ১৫ হাজার গভীর নলকূপ সৌরবিদ্যুৎচালিত এলএলপি পাম্প (লো লিফট পাম্প) আওতায় এনে নেট মিটারিং এর মাধ্যমে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বিএমডিএ প্রতিবছর প্রায় দেড়শত কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় রূপান্তর করা সম্ভব হলে এ ব্যয় কমিয়ে বছরে প্রায় ২০-৩০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।’
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করেও বিএমডিএ আয় করতে পারবে। এর ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় নির্বাহে আর্থিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে। এ ছাড়া কার্বন ক্রেডিটের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর বিষয়েও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সৌরবিদ্যুৎতের ব্যবহার সম্প্রসারণের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি এ খাত থেকে অতিরিক্ত আয় অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক সেচব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকের সেচব্যয় হ্রাস এবং বিএমডিএর আর্থিক সক্ষমতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সৌর সেচযন্ত্রের প্রতিটি অংশ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। পাম্প, মোটর, সোলার প্যানেল, কন্ট্রোলার ও ইনভার্টারের কার্যক্রম সম্পর্কে দক্ষতা বাড়লে যন্ত্রের অপ্রয়োজনীয় বিকলতা কমানো সম্ভব হবে। এর ফলে সেচ কার্যক্রম সচল রাখা এবং কৃষকদের সেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে। তাই এ ধরনের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিএমডিএর মাঠপর্যায়ের সেচব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়তে এ ধরনের প্রশিক্ষণের বিকল্প নাই তাই দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণটি সহায়ক ভূমিকা রাখবে প্রশিক্ষণার্থীদের।’
সভাপতির বক্তব্যে প্রকৌশলী ড. মো. আবুল কাসেম বলেন, ‘সৌর সেচব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষ জনবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু আধুনিক যন্ত্র স্থাপন করলেই হবে না, সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার এবং নিয়মিত পরিচর্যাও নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান মাঠপর্যায়ে কাজে লাগাতে হবে, যাতে সেচযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বজায় থাকে এবং কৃষকরা সময়মতো সেচসেবা পান।’
প্রশিক্ষণে সৌর সেচযন্ত্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশের কার্যক্রম বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ছিল সোলার প্যানেল, পিভি জাংশন বক্স, পাম্প কন্ট্রোলার, ইনভার্টার, পাম্প ও মোটরের ব্যবহার এবং স্বয়ংক্রিয় সুইচিং ডিভাইসের কার্যপদ্ধতি। পাশাপাশি পাম্প চালুর আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, পানির প্রবাহ ও মোটরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ, কন্ট্রোলারের বিভিন্ন ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং সম্ভাব্য সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হয়।
প্রশিক্ষণে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল লতিফ, মো. জিন্নুরাইন খান ও মো. তরিকুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তোফাজ্জল আলী সরকার, মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও মো. আতিকুর রহমান, এসএসআরইএলের জেনারেল ম্যানেজার মো. আরিফুল ইসলাম, ডেপুটি ম্যানেজার মো. আশিক রাব্বিসহ প্রশিক্ষণে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের রাজশাহী রিজিয়নের আওয়াধীন বিভিন্ন জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী, মেকানিকসহ ৩০ জন অংশগ্রহণ করেন।
বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিকে আরও উৎপাদনমুখী ও টেকসই করতে আধুনিক সেচপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট জনবলের দক্ষতা উন্নয়নে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কেকে/এআই