পুলিশের হেফাজত থেকে মুক্তি পাওয়ার একদিন পরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ্য করে সামাজিক মাধ্যম এক্সে প্রায় ৮ মিনিটের বিবৃতি দিয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। তবে তার সহযোদ্ধারা এখনও বিচার বিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন, সোমবার (১৯ অক্টোবর) একজন বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাদের হেফাজতের মেয়াদ আরও দুই দিন বাড়িয়েছেন।
অভিজিৎ দীপকের বিবৃতি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো:
নরেন্দ্র মোদি, ২৬ বছর বয়সি সৌরভ দাসকে জেলে আটকে রেখে নিশ্চয়ই আপনি নিজেকে খুব শক্তিশালী মনে করছেন? রাস্তায় শিশুদের মারধর করে, পুরো দিল্লিকে ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলে, আর শিক্ষার্থীদের রাস্তায় টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়েও নিশ্চয়ই আপনি নিজেকে খুব শক্তিশালী মনে করছেন?
সৌরভ ও আশুতোষ (রাঙ্কা) জাতীয় পতাকা ওড়াতে যন্তর-মন্তরে গিয়েছিল। এর জেরে তাদের পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়। এরপর তাঁদের শুনানির প্রক্রিয়াটিই আটকে দেওয়া হয়... প্রতিদিন কোনো না কোনো অজুহাতে ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁদের শুনানি পিছিয়ে দেওয়া হতে থাকে।
৩০ বছর বয়সি আশুতোষকে কারাগারে রাখা, ২৬-২৭ বছর বয়সি সৌরভ দাসকে কারাগারে রাখা; এভাবে বিশ্বগুরু নরেন্দ্র মোদি নিশ্চয়ই খুব শক্তিশালী বোধ করছেন।
এটাই শক্তি! পুলিশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা, আদালতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা, এটাই নরেন্দ্র মোদির ‘শক্তি’।
এমন দুইজন তরুণের বিরুদ্ধে পুরো রাষ্ট্রীয় যন্ত্রকে ব্যবহার করা হচ্ছে, যারা তার (মোদির) নিজের নাতি-নাতনিদের বয়সি হতে পারত, যদি তার কোনো পরিবার থাকত, যদি তার কোনো সন্তান থাকত! সৌরভ দাস ও আশুতোষ তার নাতি-নাতনিদের বয়সিই হতো। সৌরভ ও আশুতোষকে কারাগারে আটকে রেখে তিনি নিজেকে অত্যন্ত শক্তিশালী বলে মনে করছেন।
আপনি নিজেকে খুব শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী বলে মনে করেন, আপনার তা-ই মনে হয়। আসলে আপনি একজন কাপুরুষ। শক্তি কাকে বলে, তা আপনাকে বলি। ২৭ বছর বয়সি সৌরভ দাস, যে জীবনে কখনো ভাবেনি যে তাকে কখনো জেলে যেতে হতে পারে; পাঁচ দিন ধরে কারাগারে।
একবার আমি সৌরভকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তুমি জেলে কতদিন টিকতে পারবে?’ আর সে বলেছিল, ‘একদিনও না!’
…সুতরাং সেই সৌরভ দাস, যিনি ভেবেছিলেন কারাগারে একদিনও টিকতে পারবেন না, তিনিই পঞ্চম দিনে আদালতে হাসিমুখে বললেন, বিচার বিভাগীয় হেফাজতের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে জেনেও তার মনে কোনো ভয় নেই। এটাই শক্তি।
পাঁচ দিন কারাগারে থাকার পর আদালতে এসেও আশুতোষের মধ্যে কোনো ভয় নেই, এটাই শক্তি।
শক্তি মানে এই নয় যে, আপনি পুরো পুলিশ বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে তাদের আড়ালে লুকিয়ে থাকবেন, অন্য কোনো শক্তির আশ্রয় নেবেন, কিংবা পুরো দিল্লি শহরকে অচল করে দেবেন। প্রকৃত শক্তি হলো, যখন আপনি জানেন যে আপনি নিজের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী কোনো শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছেন এবং এই লড়াইয়ের পরিণাম কী হতে পারে তা-ও আপনার জানা আছে। তবুও আপনি লড়াই চালিয়ে যান।
একেই বলে শক্তি — আপনার মতো নয়, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দিয়েছেন। ট্রাম্পের সামান্য চাপে আপনি পুরো ভারতের স্বার্থ বিসর্জন দিলেন! আর আপনি নিজেকে শক্তিশালী নেতা বলে দাবি করেন! আপনি কোনো শক্তিশালী নেতা নন। আপনি এই দেশের দেখা সবচেয়ে বড় কাপুরুষ।
আর ভারতের জন্য এটি অত্যন্ত লজ্জার বিষয় যে, তাদের এমন একজন প্রধানমন্ত্রী রয়েছেন যিনি এতটাই ভীতু ও কাপুরুষ যে, তিনি পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর আড়ালে লুকিয়ে থাকেন, ব্যবস্থার আড়ালে আশ্রয় নেন; আর সারাক্ষণ কেবল একটি কথাই ভাবেন — আমার (মোদি) বিরুদ্ধে কথা বলা শিশুদের কি কারাগারে বন্দি করব, নাকি তাদের রাস্তায় টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাব, অথবা অন্য কোনো উপায়ে তাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেব?
তবে জনাব মোদি, আপনাকে দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, আমাদের কেউই আপনাকে ভয় পায় না এবং আমরা কেউই এ বিষয়ে চুপ করে থাকব না। আপনি আমাকে দুবার কারাগারেও পাঠিয়েছেন; আর যদি মনে করে থাকেন যে আমরা চুপ করে থাকব বা কথা বলা বন্ধ করে দেব, তবে আপনি ভুল করছেন। এটি আপনার একটি ভ্রান্ত ধারণা। আপনি হয়তো অনেককে কিনে নিয়েছেন বা অনেকের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দিয়েছেন, কিন্তু দেশের তরুণ প্রজন্মকে আপনি স্তব্ধ করতে পারবেন না।
আমি আশু ও সৌরভকে নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু তারা যখন হাসিমুখে আদালতে এলো, তখন তাদের দেখে আমিও সাহস পেলাম। আপনারা যে সৌরভকে ভয় দেখাতে চাইছেন, সে-ই দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে, আমি আপনাদের এই নিশ্চয়তা দিচ্ছি। কারণ, আপনারা যদি মনে করে থাকেন যে তাকে দেখে এই বার্তাটি ছড়িয়ে পড়বে যে, যারা মোদির বিরুদ্ধে কথা বলবে, তাদের এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে, তবে আসলে ঘটছে ঠিক তার উল্টোটা। সে লাখ লাখ তরুণকে অনুপ্রাণিত করছে যেন তারা (ভয়ে]) এক পা-ও পিছিয়ে না আসে এবং মোদির মতো কোনো ব্যক্তিকে ভয় না পায়।
সুতরাং, আপনারা আপনাদের পুরো পুলিশ বাহিনীকে আমাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতে পারেন, সমস্ত ব্যাটালিয়নকে আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে পারেন। আপনারা আমার এবং প্রতিবাদরত অন্যদের ওপর ঠিক এটাই করেছেন। করুন তবে! এর বাইরে আপনাদের আর কিছুই করার নেই। আপনাদের হাতে অন্য কোনো উপায় নেই; রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছাড়া আপনারা আর কিছুই করতে পারেন না।
দেশের যে বিরোধী পক্ষ (রাজনৈতিক দলগুলো) আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তাদের নিশ্চিহ্ন করতে আপনি এটিই ব্যবহার করেছিলেন। আর এখন দেশের তরুণ প্রজন্মকে স্তব্ধ করতে, ভয় দেখাতে এবং তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে আপনি রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের সেই একই অপব্যবহার করতে চাইছেন।
‘মেরি কম’ নামে একটি সিনেমা আছে, যদি আপনি সেটি দেখে থাকেন, তাতে একটি সংলাপ ছিল: কাউকে এত বেশি ভয় দেখিয়ো না যে তার ভয়টাই পুরোপুরি উধাও হয়ে যায়।
জনাব মোদি, আপনাকে শুধু এটুকুই বলতে চাই, আপনি দেশের তরুণদের এতটাই ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে, এখন আমাদের ভেতর থেকে সেই ভয়ই উবে গেছে। তাই আমরা আর ভয় পাব না।
সূত্র : দ্য ওয়্যার
কেকে/এমএ