চলতি বছরের মধ্যে দেশের ৪০ লাখ ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে কৃষি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য ১০ ধরনের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে ফসলের উপকরণ সহায়তা, সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ, ফসলের বিমা ও আগাম আবহাওয়ার তথ্য পাওয়ার সুবিধা।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকালে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে আখচাষিদের প্রণোদনা প্রদান উপলক্ষে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ ঘোষণা দেন।
জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি সরকার গঠনের সাত দিনের মধ্যে দেশের ১৩ লাখ কৃষকের এক লাখ টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।’
নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কৃষি কার্ডের সুবিধা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘এ কার্ডের মাধ্যমে বছরে অন্তত একটি ফসলের প্রয়োজনীয় সার, বীজ ও কীটনাশক বিনা মূল্যে অথবা ভর্তুকিতে দেওয়া হবে। এ ছাড়া সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ, ফসলের বিমা এবং মুঠোফোনে আগাম আবহাওয়ার বার্তা পাওয়ার সুবিধা থাকবে।’
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের এ কর্মসূচির আওতায় আনার কথা জানান তিনি।
পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, কৃষি ও সেচব্যবস্থার উন্নয়নে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। কৃষকদের সেচসুবিধা নিশ্চিত করা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনর্ভরণে সরকার আবারও খাল খনন ও নদী সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘গত আট মাসে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার খাল খননের কাজ শেষ হয়েছে।’
পানিসংকট নিরসনে রাজশাহীতে পদ্মা ব্যারেজ এবং উত্তরাঞ্চলে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
তার দাবি, প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের অন্তত ১৪টি জেলার পানিসংকট নিরসনে সহায়তা হবে। পাশাপাশি ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হবে ১৫০ শয্যার, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে ১৫০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনতে বন্ধ মিল-কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করে এরই মধ্যে ছয়টি বন্ধ কারখানা চালু করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আগামী ১২ মাসেও আরও শিল্পকারখানা চালুর প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
অনার্স পর্যন্ত মেয়েদের বিনা মূল্যে শিক্ষার পরিকল্পনা, নারীশিক্ষা সম্প্রসারণে মেয়েদের অনার্স বা ডিগ্রি পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা বিনা মূল্যে করার পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি মেধাবী ছাত্রীদের উপবৃত্তি দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
এ ছাড়া, পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ফ্যামিলি কার্ড চালুর কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘এ কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের মায়েদের হাতে প্রতি মাসে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।’
এর মাধ্যমে সন্তানদের পুষ্টি ও শিক্ষার চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র পুঁজি গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে ঢাকার ওসমানী উদ্যানে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
আহত জুলাই যোদ্ধাদের সুচিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের দায়িত্ব বিএনপি নিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
‘বিএনপি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে সমানভাবে ধারণ করে।’
জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কিছু রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি না পাঠানোর বিষয়েও সমালোচনা করেন তিনি।
শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি করে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্টের ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, পলাতক স্বৈরাচার সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করছে এবং দেশের ভেতরের কিছু রাজনৈতিক চক্রের সঙ্গে মিলে কলকারখানায় অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।’
এ বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য দেন বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন সৈকত, বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মণ্ডল এবং রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবু সাঈদ চাঁদ প্রমুখ।
সভায় বক্তব্য দেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন সভা সঞ্চালনা করেন। এ সময় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবিবা ও সানজিদা তুলি, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী জয়ন্ত কুমার কুন্ড এবং বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) ওবায়দুর রহমান চন্দন উপস্থিত ছিলেন।
রাজশাহীর কর্মসূচি শেষে বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে শাহ মখদুম বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রীর।
কেকে/এমএ