বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,
১২ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে ইউনিক্লোকে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান      ● বাংলাদেশে জেবিআইসির কার্যালয় খোলার অনুরোধ প্রধানমন্ত্রীর      ● ডেঙ্গুতে একদিনে রেকর্ড ১১ মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ৪০০      ● হাম ও উপসর্গে আরও ৭ শিশুর প্রাণহানি      ● ঢাকার পূর্বাঞ্চল ও চট্টগ্রামের কিছু অংশে বিদ্যুৎ বিপর্যয়      ● বাংলাদেশ-জাপান বন্ধুত্বকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে রূপ দিতে চান তারেক রহমান      ● টোকিওতে তারেক রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা তাকাইচির      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
মাদরাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতন: সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের তাগিদ
লায়ন মো. গনি মিয়া বাবুল
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:১২ পিএম আপডেট: ২৮.১০.২০২৬ ১২:১৯ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী শুধু পাঠ নিতে আসে না; এখানে শিক্ষার্থী আসে নিরাপদে বেড়ে উঠতে, জ্ঞান ও মূল্যবোধ অর্জন করতে এবং নিজের সম্ভাবনা বিকশিত করতে। মাদরাসার ক্ষেত্রেও এই প্রত্যাশা একই। ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিকতার চর্চা যেখানে মুখ্য, সেখানে শিক্ষার্থীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বা অপমানের অভিযোগ সমাজকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়। কোনো শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হলে তার শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি তৈরি হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী ভয়, লজ্জা, মানসিক আঘাত এবং শিক্ষার প্রতি অনীহা। আবার অভিযোগ উঠলেই যাচাই ছাড়া কোনো শিক্ষককে অপরাধী বলে চাপিয়ে দেওয়া হলে তার সম্মান, জীবিকা ও পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ন্যায়বিচারের দাবি দ্বিমুখী।

নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীকে সুরক্ষা ও প্রতিকার দিতে হবে, আর অভিযুক্ত শিক্ষককেও ন্যায্য তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। তবে এই ভারসাম্যকে অজুহাত করে কোনো অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া চলবে না, আবার জনরোষকে বিচারের বিকল্প করাও গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে প্রমাণ, তদন্ত ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া। প্রতিষ্ঠানের প্রভাব, সামাজিক পরিচিতি, ধর্মীয় মর্যাদা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার যেন বিচারকে প্রভাবিত করতে না পারে, সে বিষয়ে সদা সচেষ্ট থাকতে হবে। শিক্ষার্থীকে চুপ করানো যেমন অন্যায়, তেমনি যাচাইহীন অভিযোগকে চূড়ান্ত রায় হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়াও অন্যায়।

বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার আইনি কাঠামো রয়েছে। শিশু আইন, ২০১৩-এর ৭০ ধারায় শিশুর দায়িত্বে বা পরিচর্যায় থাকা ব্যক্তির দ্বারা আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলা কিংবা পরিত্যাগের ফলে শিশুর অহেতুক দুর্ভোগ বা স্বাস্থ্যের ক্ষতি হলে শাস্তির বিধান রয়েছে। শাস্তির পরিমাণ ও কোন আইন প্রযোজ্য হবে, তা নির্দিষ্ট ঘটনার তথ্য ও তদন্তের ভিত্তিতে আদালত নির্ধারণ করে। শিশু আইন, ২০১৩-এর ৭০ ধারা দেখায়, শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাবিধির বিষয়মাত্র নয়; এটি আইনের প্রশ্ন। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০১১ সালের নির্দেশনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর আওতায় মাদ্রাসাও রয়েছে। বেত্রাঘাত, চড়-থাপ্পড় বা অপমানজনক আচরণকে শিক্ষাদানের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি বলা যায় না।

আইন ও নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও অভিযোগ উঠলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, শিক্ষার্থী এখন নিরাপদ কি না। তার চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা এবং নির্ভরযোগ্য অভিভাবক বা সহায়তাকারীর কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা হয়েছে কি? অভিযোগ তদন্তের জন্য রেকর্ড, সাক্ষ্য বা প্রাসঙ্গিক তথ্য সংরক্ষিত আছে কি? অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার তাগিদে অভিযোগকারীকে অভিযোগ প্রত্যাহারে চাপ দেওয়া হয়, ঘটনাকে ‘শাসন’ বলে ব্যাখ্যা করা হয় অথবা অভিযুক্ত ব্যক্তিই শিক্ষার্থীর কাছে থেকে যান। এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্বাধীন তদন্তের পথ বন্ধ হয় এবং অন্য শিক্ষার্থীরাও ভবিষ্যতে কথা বলতে ভয় পায়। অভিযোগের পরপরই শিশুকে নিরাপদ পরিবেশে রাখা, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং তার বক্তব্য নির্ভয়ে শোনার ব্যবস্থা জরুরি।

অভিযোগ পাওয়ার পর প্রাথমিক সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া মানেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা নয়। গুরুতর অভিযোগে তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে শিক্ষার্থীর সরাসরি তত্ত্বাবধান থেকে সরিয়ে রাখা যেতে পারে, যাতে অভিযোগকারী নিরাপদে থাকে, সাক্ষীর ওপর চাপ না পড়ে এবং তদন্তে হস্তক্ষেপের ঝুঁকি কমে। ব্যবস্থা হতে হবে অস্থায়ী, লিখিত ও পর্যালোচনাযোগ্য। একই সঙ্গে অভিযোগকারীর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখতে হবে।

বিচারপ্রক্রিয়ায় তদন্তের মান নির্ভর করে নিরপেক্ষতার ওপর। মাদরাসা কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু গুরুতর অপরাধের অভিযোগে সেটিই একমাত্র তদন্ত হওয়া উচিত নয়। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে আইন অনুযায়ী কাজ করতে হবে। অভিভাবক, প্রত্যক্ষদর্শী, সহপাঠী, চিকিৎসক এবং অন্য প্রাসঙ্গিক ব্যক্তির বক্তব্য নিতে হবে।

শিশুকে বারবার একই ঘটনা বলতে বাধ্য না করে, তার বয়স ও মানসিক অবস্থার উপযোগী পদ্ধতিতে তদন্তপ্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে হবে। অভিযোগের সময়, স্থান, চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য এবং প্রাসঙ্গিক নথি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা জনশ্রুতি তদন্তের বিকল্প নয়। একইভাবে, প্রভাবশালী কারও মৌখিক অস্বীকৃতিও অভিযোগ খারিজের ভিত্তি হতে পারে না। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন তদন্তকারীকে প্রভাবিত করতে, সাক্ষীকে ভয় দেখাতে বা অভিযোগকারীকে সমঝোতায় বাধ্য করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

দোষ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলকভাবে শাস্তি কার্যকর হতে হবে। পদ, পরিচিতি, ধর্মীয় মর্যাদা কিংবা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রভাব যেন দায়মুক্তির কারণ না হয়। অপরাধের ধরন অনুযায়ী ফৌজদারি বিচার, চাকরিগত ব্যবস্থা কিংবা স্বীকৃতি বা পরিচালনার বিধি অনুযায়ী যে পদক্ষেপ প্রযোজ্য, তা নিতে হবে। শাস্তি শুধু প্রতিশোধ নয়; এর উদ্দেশ্য ভবিষ্যৎ অপরাধ ঠেকানো এবং শিক্ষার্থীদের কাছে এই বার্তা দেওয়া যে তাদের নিরাপত্তা বাস্তব অগ্রাধিকার। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত না হলে বা তদন্তে অসদুদ্দেশ্যপূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সুনাম পুনরুদ্ধার ও ন্যায্য প্রতিকারও জরুরি। অভিযোগ প্রমাণ না হওয়া আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ হওয়া এক কথা নয়। এই দুই অবস্থাকে এক করে দেখলে সত্যিকারের ভুক্তভোগীরা আরও চুপ হয়ে যাবেন।

নিরপরাধ শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষা করা মানে তাদের প্রতি জবাবদিহি কমানো নয়; বরং ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্তগুলো সবার জন্য একই রাখা। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় ও আইনানুগ আচরণের অধিকার স্বীকৃত। একই অনুচ্ছেদ ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম ও সম্পত্তির বিরুদ্ধে আইনবহির্ভূত পদক্ষেপও নিষিদ্ধ করে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ তাই অভিযোগ প্রকাশের আগে যাচাই, অভিযুক্তকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ, গোপনীয়তা এবং প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত—শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ের সুরক্ষার জন্যই জরুরি। দায়িত্বশীল জনপরিসরে অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে হবে, কিন্তু আদালতের রায় বা তদন্তের ফলাফলের আগে কাউকে সামাজিকভাবে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কাগুজে নীতিমালা যথেষ্ট নয়; কার্যকর শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা চাই। প্রতিটি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ কমিটি এমন ব্যক্তিদের নিয়ে গঠন করা দরকার, যাঁরা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা অভিযুক্ত ব্যক্তির একক নিয়ন্ত্রণে নন। সম্ভব হলে সেখানে নারী প্রতিনিধি, শিশু সুরক্ষা বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং অভিভাবক প্রতিনিধি থাকবেন। কমিটির কাজের সময়সীমা, গোপনীয়তা, জরুরি ঝুঁকিতে করণীয় ও কর্তৃপক্ষকে জানানোর পদ্ধতি লিখিতভাবে জানাতে হবে। অভিযোগকারী যেন জানেন, কার কাছে যাবেন, এরপর কী হবে এবং তাঁর বক্তব্য কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে। সাধারণ শৃঙ্খলাভঙ্গ আর নির্যাতনের অভিযোগকে একই নিয়মে সামলানো যাবে না।

শিশুরা সব সময় সরাসরি অভিযোগ করতে পারে না। ভয়, নির্ভরশীলতা, লজ্জা কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির ক্ষমতার কারণে তারা নীরব থাকতে পারে। তাই আবাসিক ও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত নিরাপদ পরিবেশে কথা বলা, অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ রাখা, দায়িত্ব বণ্টনে স্বচ্ছতা আনা এবং অভিযোগ বাক্স বা নির্দিষ্ট যোগাযোগব্যক্তি রাখার ব্যবস্থা করা দরকার। অভিযোগ কমিটির যোগাযোগ নম্বর ও শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮ এমন জায়গায় প্রকাশ করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা সহজেই দেখতে পায়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১০৯৮ শিশুদের সহায়তার জন্য চালু সরকারি হেল্পলাইন। শিশুর নিরাপত্তা বা নির্যাতন নিয়ে সহায়তা চাইতে এটি ব্যবহার করা যায়।

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও সমান জরুরি। রাগের মাথায় শাস্তি দেওয়া, শিক্ষার্থীকে সবার সামনে অপমান করা, গালমন্দ করা বা ভয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা—এসবকে শৃঙ্খলা রক্ষার নামে স্বাভাবিক করা যাবে না। শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষ ও আবাসিক পরিবেশে শিশুদের আচরণ সামলানোর অহিংস পদ্ধতি, ঝুঁকির লক্ষণ চিনে সহায়তা চাওয়া, অভিযোগ পেলে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয় এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা বজায় রাখার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অতিরিক্ত কর্মভার, জনবলসংকট বা আবাসিক তত্ত্বাবধানে দুর্বলতা কোনো নির্যাতনের অজুহাত নয়। তবে এসব ঘাটতি সংশোধন না করলে ঝুঁকি বাড়ে। শিক্ষা বোর্ড, অধিদপ্তর, মাদরাসা পরিচালনা কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়মিত পরিদর্শন, অভিযোগের নথি পর্যালোচনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সহায়তামূলক তদারকি করতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ সমন্বয়কারী সংস্থা আল-হাইআতুল উলয়া শিক্ষার্থী নির্যাতন প্রতিরোধে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করা, সুরক্ষা কমিটি সক্রিয় রাখা, অভিযোগ তদন্ত এবং পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশনা দিয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করেছে, তবে নির্দেশ জারি করাই শেষ কথা নয়। কমিটি সত্যিই কাজ করছে কি না, অভিযোগকারীরা নিরাপদে কথা বলতে পারছেন কি না এবং কর্তৃপক্ষ সময়মতো ব্যবস্থা নিচ্ছে কি না, তা প্রকাশযোগ্য তথ্য ও নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। আলিয়া ও কওমি—সব ধারার প্রতিষ্ঠানে সুরক্ষার ন্যূনতম মান নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

মাদরাসার শিক্ষকেরাও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বহু শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে পড়ান, শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান এবং সীমিত সম্পদে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ভূমিকা রাখেন। একজনের অপরাধে পুরো শিক্ষকসমাজকে অভিযুক্ত করা যেমন অন্যায়, তেমনি শিক্ষকসমাজের মর্যাদার অজুহাতে অভিযোগকে অবিশ্বাস করাও অন্যায়। প্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া—অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া, সত্য না হলে তা স্পষ্ট করা এবং শিক্ষার্থীকে সহায়তা দেওয়া। অন্যায় আড়াল করলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ে না; বরং নষ্ট হয়।

একটি সুস্থ শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক হবেন নিরাপত্তা ও জ্ঞানের সহায়ক, আর শিক্ষার্থী থাকবে মর্যাদা ও সুরক্ষার অধিকারী। এই সম্পর্ক ভয়ের ওপর দাঁড়াতে পারে না। অভিযোগের পর শিক্ষার্থীকে চুপ করানো, তদন্তের আগে শিক্ষককে অপমান করা কিংবা প্রতিষ্ঠানের নাম জড়িয়ে সবাইকে সন্দেহ করা—কোনোটিই সমাধান নয়। প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যেখানে নিরাপদে অভিযোগ করা যায়, স্বাধীনভাবে সত্য যাচাই হয়, দোষী ব্যক্তি আইনের মুখোমুখি হন, নির্দোষ ব্যক্তি ন্যায্য প্রতিকার পান এবং প্রতিটি শিক্ষার্থী জানে, তার কথা শোনা হবে। মাদরাসার মর্যাদা রক্ষা ও শিক্ষার্থীর অধিকার নিশ্চিত করা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং ন্যায়, মানবিকতা ও জবাবদিহির পথে এগোলেই দুটিই সম্ভব।

মাদরাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতন বন্ধে কেবল নিন্দা বা সাময়িক ক্ষোভ যথেষ্ট নয়; দরকার অভিযোগ জানানোর নিরাপদ প্রক্রিয়া, নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ। একই সঙ্গে প্রমাণ ছাড়া কোনো শিক্ষককে দোষী সাব্যস্ত না করে তার আত্মপক্ষ সমর্থন ও ন্যায্য বিচারের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। দোষীদের বিচার নিশ্চিত করা এবং নিরপরাধ শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষা—এই দুই দায়িত্ব আলাদা নয়; দুটিই ন্যায়বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অপরাধ আড়াল না করা, নির্দোষকে অপমান না করা এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই শিক্ষক ও মাদরাসার প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তাই মাদরাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতনে জড়িত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে ও নিরপরাধ শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষায় প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ।

লেখক: শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক


কেকে/সাশ 


আরও সংবাদ   বিষয়:  মাদরাসায় নির্যাতন   মতামত   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close