একসময় বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল— দেশের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করা যাবে কি না। স্বাধীনতার পর খাদ্যঘাটতি, দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সীমিত কৃষি উৎপাদনের কঠিন বাস্তবতার কারণে দীর্ঘদিন আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানো। সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশ আজ অনেক দূর এগিয়েছে। ধান, সবজি, মাছ, ডিম, দুধ, মাংসসহ বিভিন্ন খাদ্যের উৎপাদন বেড়েছে। কৃষিতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত সম্প্রসারিত হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট-বড় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠেছে। মানুষের আয়, নগরায়ণ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে খাদ্যের বাজারও দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
এখন তাই নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। আমরা কত খাদ্য উৎপাদন করছি, শুধু সেই হিসাবই কি যথেষ্ট? নাকি আমাদের জানতে হবে— যে খাদ্য উৎপাদন করছি তা কতটা পুষ্টিকর, কতটা নিরাপদ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আছে কি না, উৎপাদনের সময় পরিবেশের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং আজকের খাদ্য উৎপাদন করতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মাটি, পানি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ আমরা কতটা সুরক্ষিত রাখতে পারছি? বাংলাদেশের আগামী দিনের খাদ্যব্যবস্থার মূল লক্ষ্য তাই হওয়া উচিত চারটি বিষয়— পুষ্টিকর, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই খাদ্য।
বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প এখন দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কয়েক দশক আগে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বলতে প্রধানত চাল, আটা, তেল, চিনি, বিস্কুট, রুটি, কেক কিংবা কয়েক ধরনের পানীয় বোঝানো হতো। এখন বাজারে দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য, ফলের রস, নানা ধরনের পানীয়, নুডলস, হালকা খাবার, সস, মসলা, হিমায়িত খাদ্য, রান্নার জন্য প্রস্তুত খাবার, সরাসরি খাওয়ার উপযোগী খাবার এবং নানা ধরনের স্বাস্থ্যসহায়ক খাদ্য পাওয়া যাচ্ছে। নগরায়ণ, কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, ছোট পরিবার এবং ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে সহজে ও দ্রুত প্রস্তুত করা যায় এমন খাবারের চাহিদা আগামী দিনে আরও বাড়বে। এটি খাদ্যশিল্পের জন্য বড় সুযোগ, তবে এর সঙ্গে বড় দায়িত্বও রয়েছে।
কারণ মানুষের পেট ভরানো আর মানুষের শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেওয়া এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের প্রচলিত খাদ্যতালিকায় এখনো ভাত ও অন্যান্য শর্করাজাতীয় খাদ্যের আধিক্য রয়েছে। ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য এবং শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু একটি সুস্থ শরীরের জন্য শুধু শর্করা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পর্যাপ্ত আমিষ, খাদ্যআঁশ, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন এবং খনিজ উপাদান। তাই মাছ, ডিম, দুধ ও মাংসের পাশাপাশি ডাল, ছোলা, সয়াবিন, বাদাম, শাকসবজি ও ফলের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী এবং প্রবীণ মানুষের পুষ্টির প্রয়োজনকে বিশেষভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
একটি পরিবারের ঘরে পর্যাপ্ত চাল থাকলেই সেই পরিবারের পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে বলা যায় না। তাদের খাদ্যে প্রয়োজনীয় আমিষ, ভিটামিন, খনিজ, খাদ্যআঁশ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও থাকতে হবে। তাই খাদ্যের পর্যাপ্ততা থেকে আমাদের চিন্তাকে পুষ্টিনিরাপত্তার দিকে নিয়ে যেতে হবে। আমরা কত ক্যালরি খাদ্য উৎপাদন করছি তার পাশাপাশি কতটা পুষ্টি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হওয়া উচিত।
এই পরিবর্তনে দেশের খাদ্যশিল্প বড় ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন খাদ্য তৈরির সময় শুধু স্বাদ, রং, দাম এবং কত দিন ভালো থাকবে— এসব বিষয় বিবেচনা করলে চলবে না। পণ্য তৈরির শুরুতেই প্রশ্ন করা প্রয়োজন, এই খাবার মানুষের পুষ্টিতে কী যোগ করছে? বিস্কুট, রুটি, কেক কিংবা হালকা খাবারে সম্পূর্ণ শস্য ও খাদ্যআঁশ বাড়ানো যেতে পারে। পানীয়তে অতিরিক্ত যোগ করা চিনি কমানো যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী আয়রন, জিংক, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি-১২ এবং ফলিক অ্যাসিডের মতো অণুপুষ্টি উপাদান যোগ করে খাদ্যের পুষ্টিমান বাড়ানো সম্ভব। শিশুদের খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানোর দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তবে খাদ্য পুষ্টিকর হলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেটিকে নিরাপদও হতে হবে। খাদ্যের নিরাপত্তার যাত্রা কারখানায় নয়, শুরু হয় কৃষকের মাঠে। কৃষিজমিতে কী ধরনের পানি ব্যবহার হচ্ছে, কী পরিমাণ সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে, পশু ও মাছ পালনে কী ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কাঁচামাল কীভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে— এসবই শেষ পর্যন্ত খাদ্যের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। এরপর রয়েছে পরিবহন, গুদামজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মোড়কজাতকরণ, বাজারজাতকরণ এবং দোকানে সংরক্ষণ। এই দীর্ঘ পথের যে কোনো পর্যায়ে খাদ্য দূষিত হতে পারে।
রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু, ছত্রাকজাত বিষাক্ত পদার্থ, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু কিংবা অনুপযুক্ত রাসায়নিক পদার্থ খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। শুধু বাজারে পৌঁছানোর পর খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা করে এসব ঝুঁকি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই আধুনিক খাদ্যবিজ্ঞানের মূল শিক্ষা হলো— শেষে পরীক্ষা করে নিরাপত্তা খোঁজার চেয়ে শুরু থেকেই নিরাপদভাবে খাদ্য উৎপাদন করা ভালো। কৃষকের মাঠে উত্তম কৃষিচর্চা, কারখানায় উত্তম উৎপাদনচর্চা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি এবং উৎপাদনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের বড় খাদ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই আধুনিক মাননিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসরণ করছে। কিন্তু দেশের খাদ্যব্যবস্থা শুধু বড় কারখানার ওপর নির্ভর করে না। স্থানীয় বেকারি, মিষ্টির দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ, কাঁচাবাজার, পথের পাশের খাবারের দোকান এবং হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাদ্য ব্যবসা এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এসব উৎস থেকে খাবার গ্রহণ করেন। তাই খাদ্যনিরাপত্তা শুধু বড় প্রতিষ্ঠানের সনদ কিংবা রপ্তানি পণ্যের শর্ত হয়ে থাকলে চলবে না। গ্রামের বাজার থেকে রাজধানীর বড় বিপণিবিতান পর্যন্ত নিরাপদ খাদ্যের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য আইন ও তদারকির পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, সহজলভ্য খাদ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং খাদ্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি করা প্রয়োজন।
ভোক্তাকেও জানতে হবে তিনি কী খাচ্ছেন। খাদ্যের মোড়কে শুধু সুন্দর ছবি বা প্রতিষ্ঠানের নাম নয়; উপাদান, পুষ্টিমান, অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে এমন উপাদান, উৎপাদনের তারিখ এবং মেয়াদ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। একজন সাধারণ মানুষ যেন সহজেই বুঝতে পারেন একটি খাবারে কত চিনি, লবণ, চর্বি, আমিষ ও খাদ্যআঁশ রয়েছে। সচেতন ভোক্তা শুধু নিজের স্বাস্থ্য রক্ষা করেন না, তিনি খাদ্যশিল্পকেও উন্নত ও স্বাস্থ্যকর পণ্য তৈরিতে উৎসাহিত করেন।
পুষ্টি ও নিরাপত্তার পাশাপাশি বাংলাদেশের সামনে আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা কৃষি উৎপাদনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে বাড়ছে জনসংখ্যা, নগরায়ণ এবং কৃষিজমির ওপর চাপ। ফলে ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হবে— কম জমি, কম পানি, কম জ্বালানি এবং কম অপচয়ে কীভাবে বেশি পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন করা যায়? এজন্য জলবায়ু সহনশীল ফসল, পানি- সাশ্রয়ী কৃষি, সঠিক সেচব্যবস্থা এবং অঞ্চলভেদে উপযোগী কৃষিপণ্য উৎপাদনের দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
খাদ্য সংরক্ষণের সঙ্গে মোড়কেরও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। পরিবেশ রক্ষার কথা উঠলেই অনেক সময় প্লাস্টিক বা মোড়ক পুরোপুরি বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু উপযুক্ত মোড়ক খাদ্যকে আলো, অক্সিজেন, আর্দ্রতা, জীবাণু ও বাইরের দূষণ থেকে রক্ষা করে এবং সংরক্ষণকাল বাড়ায়। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত মোড়ক বাদ দেওয়া নয়; বরং যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু, সহজে পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং পরিবেশের ওপর কম চাপ সৃষ্টি করে এমন মোড়ক ব্যবহার করা। অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত মোড়ক কমানোর পাশাপাশি উপযুক্ত ক্ষেত্রে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত ও প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয়যোগ্য উপাদানের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।
বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের আরেকটি বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে এমন উপাদানে, যেগুলোকে আমরা সাধারণত বর্জ্য মনে করি। ধান ভাঙানোর পর চালের কুঁড়া, ফল প্রক্রিয়াজাত করার পর খোসা ও বীজ, মাছ কাটার পর চামড়া ও আঁশ— এসবের অনেকটাই মূল্যবান কাঁচামাল। চালের কুঁড়া থেকে তেল ও আমিষ, ফলের খোসা থেকে খাদ্যআঁশ ও পেকটিন, মাছের চামড়া ও আঁশ থেকে কোলাজেন ও জিলাটিন, ফলের বীজ থেকে তেল এবং কৃষিজ উপজাত থেকে পশুখাদ্য, জৈব সার কিংবা জৈবশক্তি তৈরি করা সম্ভব। অর্থাৎ আজকের বর্জ্য আগামী দিনের কাঁচামাল হতে পারে। এক শিল্পের উপজাতকে অন্য শিল্পের সম্পদে পরিণত করার এই ধারণা বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে নতুন শিল্পের বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।
পানি ও জ্বালানির ব্যবহারেও পরিবর্তন প্রয়োজন। খাদ্য কারখানায় কাঁচামাল ধোয়া, উত্তপ্ত করা, শীতল করা এবং যন্ত্রপাতি পরিষ্কারে প্রচুর পানি ও শক্তি লাগে। পানি-সাশ্রয়ী পরিষ্কারব্যবস্থা, নিরাপদ ক্ষেত্রে পরিশোধিত পানির পুনর্ব্যবহার, উৎপাদনের অতিরিক্ত তাপ পুনরুদ্ধার করে অন্য কাজে ব্যবহার, শক্তি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি এবং উন্নত শীতলীকরণ ব্যবস্থা উৎপাদন ব্যয় ও পরিবেশগত চাপ— দুটিই কমাতে পারে। বাংলাদেশের খাদ্য কারখানায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এবং কৃষিপণ্য শুকানোর কাজে সৌরশক্তির প্রয়োগও আরও বাড়ানো যেতে পারে।
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি খাদ্যশিল্পকে আরও নিরাপদ ও দক্ষ করতে পারে। একটি খাদ্যের কাঁচামাল কোথা থেকে এসেছে, কখন কারখানায় প্রবেশ করেছে, কোন উৎপাদনদলে তৈরি হয়েছে এবং কোথায় বিক্রি হয়েছে— এই তথ্য দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা গড়ে তুললে কোনো সমস্যা দেখা দিলে নির্দিষ্ট পণ্য দ্রুত বাজার থেকে প্রত্যাহার করা সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য বিশ্লেষণের সাহায্যে বাজারের চাহিদা অনুমান, কাঁচামালের অপচয় শনাক্ত, উৎপাদন পরিকল্পনা এবং যন্ত্রপাতির সম্ভাব্য ত্রুটি আগাম নির্ণয় করাও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে আধুনিক যন্ত্রপাতি কিনলেই আধুনিক খাদ্যশিল্প তৈরি হয় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো দক্ষ মানুষ। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খাদ্যবিজ্ঞান, খাদ্য প্রকৌশল, পুষ্টিবিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞান, অণুজীববিজ্ঞান ও জীবপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বহু তরুণ পড়াশোনা করছেন। এই জ্ঞানকে শিল্পের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা যদি শুধু গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং শিল্পের বাস্তব সমস্যা গবেষকের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে উদ্ভাবনের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং খাদ্যশিল্পের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন।
সরকারের নীতিতেও একই ধরনের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। কৃষিকে শুধু কৃষির বিষয়, খাদ্যশিল্পকে শুধু শিল্পের বিষয়, পুষ্টিকে শুধু স্বাস্থ্য খাতের বিষয় এবং পরিবেশকে আলাদা বিষয় হিসেবে দেখলে একটি টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন। কৃষকের মাঠ থেকে মানুষের খাবারের থালা পর্যন্ত পুরো পথকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে। ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসায়ীদের নিরাপদ উৎপাদন ও স্বাস্থ্যবিধির প্রশিক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি, শীতল সরবরাহব্যবস্থায় বিনিয়োগ, কৃষিভিত্তিক নতুন শিল্পে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ— সবকিছুকে একই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার অভাব নেই। আমাদের কৃষি আছে, বৈচিত্র্যময় কৃষিপণ্য আছে, বড় ভোক্তাবাজার আছে, দ্রুত বিকাশমান খাদ্যশিল্প আছে এবং রয়েছে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী। এখন প্রয়োজন এসব শক্তিকে একই সুতোয় গাঁথা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ খাদ্যশিল্পকে তাই শুধু ‘খামার থেকে খাবারের থালা’ পর্যন্ত ভাবলে চলবে না; আমাদের লক্ষ্য হতে হবে ‘খামার থেকে পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও টেকসই ভবিষ্যৎ।’
একুশ শতকে খাদ্যশিল্পের সাফল্য শুধু কত লাখ টন খাদ্য উৎপাদিত হলো তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। দেখতে হবে—কত কম জমি, পানি ও জ্বালানি ব্যবহার করে কত বেশি পুষ্টি মানুষের কাছে পৌঁছানো গেল, কতটা খাদ্য অপচয় থেকে রক্ষা করা গেল, কৃষক কতটা ন্যায্যমূল্য পেলেন এবং পুরো প্রক্রিয়ায় প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কতটা সুরক্ষিত রাখা গেল। যে খাদ্য মানুষের পেট ভরাবে, শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেবে, নিরাপদ থাকবে, কৃষককে ন্যায্যমূল্য দেবে এবং একই সঙ্গে মাটি, পানি ও পরিবেশ রক্ষা করবে— সেই খাদ্যই হওয়া উচিত আগামী বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের লক্ষ্য।
লেখক : খাদ্য বিজ্ঞানী, বার্মিংহাম ইউকে
কেকে/এআই