মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
খালেদা জিয়া : রাষ্ট্র, রাজনীতি ও এক আপসহীন নারী
দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:৫২ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের অবসান ঘটল আজ! বেগম খালেদা জিয়া, বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী; শুধু নারী হিসেবেই নয়, নির্বাচনের দিক দিয়েও তিনি প্রথম নির্বাচিত! তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ, এক অনমনীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, একজন আপসহীন নেত্রী। তিনি আর নেই, এটা ভাবতে কষ্ট লাগছে! তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হলো, যা শুধু একটি দলের বা একটি কালের নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসেই একজন নেতার গভীর অনুপস্থিতি।

১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করা খালেদা জিয়ার জীবন রাজনীতিতে প্রবেশের আগে ছিল তুলনামূলকভাবে নীরব ও ব্যক্তিগত। ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বেগম জিয়ার জীবনের গতিপথ আমূল পরিবর্তিত হয়। ব্যক্তিগত শোক কাটিয়ে উঠে তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতির কঠিন ও অনিশ্চিত পরিসরে নিজের নেতৃত্ব ও পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নয়, বরং একটি সময়ের প্রতিনিধিত্ব করতে শুরু করেন। খুব কম বয়সের তার এ পথ চলা শুরু হয়! 

১৯৯১ সালে সামরিক শাসন-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসেবে তার দায়িত্ব গ্রহণ ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা! সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের সেই সন্ধিক্ষণে এক জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্র পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬, এই দুই মেয়াদে তার নেতৃত্ব বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। তার এই সময়কালে তিনি প্রচুর উন্নয়ন নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে। স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক ধরনের বিপ্লব আনয়ন করা, অপারেশন ক্লিনহার্টের মাধ্যমে দেশের সন্ত্রাস দমন করা- এগুলো ছিল বেগম জিয়ার একেকটি অনন্য পদক্ষেপ। 

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন কখনোই বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। তীব্র দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ক্ষমতার সংঘাত, আন্দোলন ও পাল্টা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে তার ক্ষমতাকাল অতিক্রান্ত হয়েছে। বিরোধী দল তাকে প্রচুর যন্ত্রণা দিয়েছে। তবে তার রাজনৈতিক আচরণে একটি বিষয় ছিল সুস্পষ্ট, তিনি কখনোই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আক্রমণ করেননি। শেখ হাসিনা বা তার পরিবারকে নিয়ে অশ্রাব্য কিংবা অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ তার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ ছিল না। এমনকি রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে চরম বিভাজনের সময়েও তিনি ভাষা ও ভঙ্গিতে সংযম বজায় রেখেছেন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল এক দৃষ্টান্ত।

ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়েও এ সংযম তার আচরণে প্রতিফলিত হয়েছে। ৫ আগস্টের পর দেওয়া একাধিক ভাষণে তিনি আওয়ামী লীগ, কিংবা শেখ হাসিনার নাম উল্লেখ করে কটূক্তি করেননি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনায় তিনি নীরবও থাকেননি, শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি প্রথম দিকেই প্রতিবাদ জানিয়েছেন, গণজাগরণ মঞ্চের উগ্র রাজনৈতিক ভাষ্যেও তার আপত্তি ছিল স্পষ্ট, এমনকি জামায়াত নেতাদের ফাঁসির ক্ষেত্রেও তিনি আইনি ও নৈতিক প্রশ্নে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করতে পিছপা হননি।

আপসহীনতা ছিল খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক চরিত্রের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ১৯৮৬ সালে স্বৈরশাসক এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ মানে ছিল সেই শাসনকে বৈধতা দেওয়া, কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নাই! বরং আওয়ামী লীগসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে। জনগণের বিরুদ্ধে করো সঙ্গে আপস না করার এই অবস্থান তাকে জনপ্রিয় করে তোলে এবং তাকে আপসহীন নেত্রীর খেতাব এনে দেয়। এ ছাড়াও তার এ অবস্থান এবং মনোভাব এরশাদ-পরবর্তী সংসদীয় নির্বাচনে জনগণ তাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করে এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলেও তার পুরোটা শাসনকালে আওয়ামী লীগ প্রচণ্ড যন্ত্রণা দিয়েছিল! ধর্মঘট আর হরতাল করে সরকার পরিচালনা করাকে অসম্ভব করে তুলেছিল! কিন্তু তার পরেও বেগম খালেদা জিয়া অসাধারণ মেধার কারণে সেই সময়ে অনেক নতুন ধরনের প্রোগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন! যার মধ্যে নারী শিক্ষার উন্নয়নের জন্য স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার প্রচলন অন্যতম! 

২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সংসদে ১৭১টি আসনে বিজয়ী হয়েও এককভাবে সরকার গঠনের পথ বেছে নেননি। পুরোনো রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গে বিশ্বাস ও আনুগত্যের সম্পর্ক ছিন্ন না করে তিনি জোট সরকার গঠন করেন। রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা তার স্বভাবে ছিল না। বন্ধুত্ব ও দায়বদ্ধতা তার চরিত্রের, বিশেষত তার রাজনীতির অংশ ছিল। 

ফ্যাসিস্ট আমলে বেগম খালেদা জিয়ার ওপর অত্যাচারের স্টিম রোলার চালানো হয়েছে! তার বাসা ছিনিয়ে নেয়য়া, তাকে বাসায় গৃহবন্দি করে রাখা, বাসায় কেউ যেন আসতে না পারে সেজন্যে বাসার সামনে ট্রাক রেখে দেওয়া- এসবই ছিল অত্যাচারের নমুনা! সব থেকে বড় কথা তাকে কথা বলতে দেওয়া হয়নি! এ ১৫ বছরে তাকে কোনো সমাবেশ করতে দেয়া হয়নি, কথা বলতে দেয়া হয় নাই! সবচেয়ে বড় কথা ৭৮ বছর বয়সে তাকে এমন এক কারাগারে রাখা হয়, যেটা ছিল পরিত্যক্ত আর যেখানে মাত্র বন্দি হিসেবে ছিলেন তিনি একা! তাকে সুস্থ থাকার জন্য কোনো চিকিৎসা নিতে দেয়া হয়নি, ঠিক মতো খাবার দেওয়া হয় নাই! বিশাল এ কারাগারে একা থেকে কোনো মানুষ সুস্থ থাকতে পারে না। তবুও ফ্যাসিস্ট সরকার তাকে এখানেই রেখেছে তার মৃত্যু ত্বরান্বিত করতে। 

২০২৪ সালে কারাবন্দি অবস্থায় তাকে শর্তসাপেক্ষ মুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, দোষ স্বীকার এবং রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার বিনিময়ে মুক্তি। কিন্তু ৭৮ বছর বয়সেও তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তাকে বারবার বলা হয়েছে বিদেশে চলে যেতে! কিন্তু ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিনিময়ে রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ তার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ছিলো অসাধারণ এবং তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা ও অটল এবং আপসহীন একজন মানুষ! 

বেগম খালেদা জিয়া সবসময়ই ছিলেন সংযত, কিন্তু দৃঢ়চেতা। দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেছেন তিনি। রাজনৈতিকভাবে তাকে কোণঠাসা করে রাখা হয়, তাকে কারাগারে রাখা হয় এবং প্রচণ্ড স্বাস্থ্যগত সংকটে ফেলা হয়, কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী প্রতীকে পরিণত হন। দল মত নির্বিশেষে তাকে সবাই পছন্দ করে, সম্মান করে এবং শ্রদ্ধা করেন! অল্প বয়সে বিধবা হয়ে, ব্যক্তিগতভাবে রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চাওয়া এ মানুষটি দল ও সহযোদ্ধাদের কল্যাণের জন্য প্রায় পাঁচ দশক আগে নেতৃত্বের গুরুদায়িত্ব  গ্রহণ করেছিলেন। তার উপস্থিতি সবসময় সমর্থকদের আশা যুগিয়েছে, ভরসা দিয়েছে! এছাড়া সাধারণ মানুষ দল মত নির্বিশেষে তাকে শ্রদ্ধা করেন এবং ভালোবাসেন!  

ইতিহাস হয়তো খালেদা জিয়ার কাজ বা সিদ্ধান্তের বিচার করবে। তার সিদ্ধান্ত, তার রাজনৈতিক কার্যকলাপ এবং তার প্রভাবের সামগ্রিকতায়। সেই বিচার হবে বহুমাত্রিক, প্রশংসা ও সমালোচনার সমান্তরালে। তবে এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণের অবকাশ নেই যে, খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য নাম। মৃত্যুর পর মানুষ পার্থিব হিসাবের ঊর্ধ্বে উঠে যায়। রাজনীতির দোষ-ত্রুটি ইতিহাস বিচার করবে; কিন্তু একজন প্রয়াত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তার জন্য প্রার্থনা কাম্য, এমনকি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কাছেও। এবং আমি মনে করি বাংলাদেশের সব মানুষ তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গেই স্মরণ করবে এবং তার জন্য দোয়া আর প্রার্থনা করবে! 

এই শোকাবহ দিনে আমি বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং আল্লাহতায়ালা যেন তাকে বেহেস্ত নসিব করেন, সেজন্যে দোয়া করছি! এর সঙ্গে তার পরিবার, সহযোদ্ধা ও অনুসারীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই, আল্লাহতায়ালা যেন তাদের এই শোক সইবার শক্তি দেন, সেই দোয়া করছি! 

লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (একাডেমিক), বাংলাদেশ ওপেন ইউনিভার্সিটি

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  খালেদা জিয়া   রাষ্ট্র   রাজনীতি   আপসহীন নারী   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close