মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
মহাকালের সমাপনী
মো. আবদুল্লাহ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারি, ২০২৬, ১১:৩৭ এএম আপডেট: ০১.০১.২০২৬ ১১:৫০ এএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫) বাংলাদেশের রাজনীতি ও জাতীয় জীবনে এমন এক শূন্যতার সূচনা হয়েছে, যা শুধুমাত্র একটি ব্যক্তির মৃত্যু নয়—এটি ছিলো এক যুগান্তকারী রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি। 

মঙ্গলবার সকাল ৬টায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে দীর্ঘ অসুস্থতার পর তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

তার মৃত্যু শুধু রাজনৈতিক শূন্যতা নয়, বরং একটি প্রজন্মের সংগ্রাম, স্বপ্ন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতিফলন—যেখানে বাংলাদেশের রাজনীতির দুই মহাপ্রভাবশালী নারীর দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব ও সহযোগিতা হয়ে উঠেছিলো নিজস্ব ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।

১. জীবন ও রাজনৈতিক উত্থান : 

বেগম খালেদা জিয়া ১৫ আগস্ট ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তার জীবন বাংলাদেশে গিয়ে মুড়িয়ে নেয় এক সাংগঠনিক, রাজনৈতিক ও সংগ্রামী পথে। তিনি প্রথম মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সফল নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে আবদ্ধ হন, যখন ১৯৯১ সালে তিনি গৃহীত বাংলাদেশের পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারের পর দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর আসনে বহাল হন।

যদিও তার রাজনৈতিক কেরিয়ার ছিলো বিতর্কিত—পুরস্কৃত যেখানে উন্নয়ন, শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারসহ নারীর ক্ষমতায়নের মতো পদক্ষেপে, তেমনি সমালোচিত ছিলো রাজনৈতিক সংঘাত ও রাজনৈতিক বিরোধিতায়—তবুও তাকে বাংলাদেশি রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঝকঝকে চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

২. দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বৈচিত্র্য : 

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিলো তার দীর্ঘস্থায়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতা—বিশেষ করে শেখ হাসিনার সঙ্গে, যিনি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং আ.লীগের নেত্রী ছিলেন। এই দ্বৈরথ বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুই মহাকাব্যিক শত্রু ও সহযোদ্ধার গল্পে পরিণত হয়েছিলো—একদিকে খালেদা জিয়া, অন্যদিকে হাসিনা—যাদের বর্জিত ঐতিহ্য ও সংঘর্ষ হাজার হাজার মানুষের জীবনে গভীর প্রতিফলিত হয়েছে।

কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়, যেখানে তিনি চেয়ারপারসন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিয়ে আসেন এবং দেশের রাজনৈতিক কৌশল ও নির্বাচনী মানচিত্রে মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেন।

৩. অসুস্থতা ও শেষ সময় : 

কয়েক মাস ধরে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে এসে খালেদা জিয়া শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার (৩০ডিসেম্বর, ২০২৫) মৃত্যুবরণ করেন। তার শরীরে জটিল স্বাস্থ্যগত সমস্যার মধ্যে ছিলো লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিস, হার্ট ডিজিজ, আর্থ্রাইটিস এবং কিডনি জটিলতা, যা চিকিৎসকদের বিশ্লেষণে তার শারীরিক অবস্থাকে দীর্ঘদিন বেশ দুর্বল করে তুলেছিলো।

এ দিন সকালে জামাত-টা-ফাজ্জর নামাজের পর তার মৃত্যু হয় এবং তার ছেলে তারিক রহমান ও পরিবারের সদস্যরা তার পাশে ছিলেন।

৪. রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা ও সমাবেত শোক : 

খালেদা জিয়ার জানাজা ও শেষকৃত্য জাতীয় সাংকেতিক গুরুত্ব পায়। তাকে রাজকীয় মর্যাদায় রাষ্ট্রীয় সম্মানে ঢাকা’য় দাফন করা হয়। লাখো সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব, স্বরাষ্ট্র, সামরিক ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক নেতারা ও প্রতিনিধি দলও আহ্বায়ক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, যেমন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী জয়শঙ্কর, যারা তার পরিবারকে সমবেদনা জানান।

তার শ্রদ্ধায় দেশজুড়ে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং একদিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়, যা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি অতুলনীয় ইভেন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়।

৫. রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট : 

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর অক্ষরে বাংলাদেশের সামনের রাজনীতিতে একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে এখন তারিক রহমান নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যিনি ইতোমধ্যেই দেশের সামনে বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়ে আগামী ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের নির্বাচন মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিচ্ছেন। 

বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যত ও ক্ষমতার ভারসাম্য এখন নতুন প্রেক্ষাপটে বসেছে, যেখানে বিএনপি, আ.লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান আগামী নির্বাচনের ফলাফল ও সমঝোতার ওপর নির্ভর করবে।

৬. মহা কালের সমাপনী : 

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু শুধুমাত্র একজন নেত্রীকে হারানো নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত—যেখানে একজন শক্তিশালী নারী নেতা, তার দীর্ঘ সংগ্রাম ও রাজনৈতিক ভ্রমণের পর চির বিশ্রামে প্রস্থান করেছেন। তার রাজনৈতিক জীবনের আলো-ছায়া, সমর্থকদের ভালোবাসা ও সমালোচকদের তীব্র প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে একটি সমৃদ্ধ, জটিল ও গভীর রাজনৈতিক ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে দীর্ঘদিন স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে অবস্থিত থাকবে।

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। তার অবদান ও ইতিহাস বাংলাদেশের মানুষের মাঝে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক: সাংবাদিক
কেকে/বি


আরও সংবাদ   বিষয়:  মহাকাল   সমাপনী   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close