কখনো পুকুরপাড়ে ভেসে ওঠে শিশুর নিথর দেহ, কখনো ঘরের ভেতর ঝুলে থাকে গৃহবধূর লাশ। কোথাও আবার বিষপানে নিভে যায় উঠতি বয়সের স্বপ্ন। এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য এখন আর খানসামা উপজেলায় বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়—বরং অপমৃত্যুর নীরব গল্প দিন দিন জমাট বাঁধছে গ্রাম থেকে গ্রামে।
দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় ২০২৫ সালে বিভিন্ন কারণে ৩০ জনের অপমৃত্যু হয়েছে। খানসামা থানা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে যেখানে অপমৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৬০ জন, সেখানে এক বছরের ব্যবধানে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। সংখ্যা কমলেও প্রতিটি মৃত্যু সমাজের জন্য এক গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে।
খানসামা থানার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের, ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ৯ জন, বিষপানে মারা গেছেন ৪ জন, বিদ্যুৎস্পর্শে মৃত্যু ২জনের, আগুনে পুড়ে মৃত্যু ১জনের, দেয়াল ধসে মৃত্যু ১ জনের, যান্ত্রিক মেশিনে মৃত্যু ১জনের, একজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি দাম্পত্য কলহে নিভে যাচ্ছে প্রাণ।
ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যার ঘটনায় দেখা গেছে, অধিকাংশই বিবাহিত নারী। পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য অশান্তি, মানসিক চাপ ও অভিমান থেকেই তারা আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী শিশুরা। বাড়ির পাশের পুকুর, খাল কিংবা ডোবাই তাদের জন্য হয়ে উঠছে মৃত্যুফাঁদ। অভিভাবকদের অসচেতনতা ও নজরদারির ঘাটতিই এসব প্রাণহানির প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
খানসামা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন অফিসার আবু সায়েম বলেন, অপমৃত্যুর একটি বড় অংশই দুর্ঘটনাজনিত। বিশেষ করে পানিতে ডুবে মৃত্যু, বিদ্যুৎস্পর্শ ও অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধযোগ্য। শিশুদের পানির আশপাশে একা না রাখা, বৈদ্যুতিক ত্রুটি দ্রুত মেরামত ও অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে অনেক প্রাণ রক্ষা সম্ভব।
বিষপানে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কিশোর-কিশোরীর সংখ্যাই বেশি। আবেগ, হতাশা ও মানসিক অস্থিরতার কারণে তারা এমন চরম সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সচেতনদের মতে, কৃষিতে ব্যবহৃত কীটনাশক সহজলভ্য না হলে এসব মৃত্যুর ঘটনা অনেকটাই কমে আসতে পারে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, অপমৃত্যুর পেছনে সামাজিক ও মানসিক নানা কারণ থাকে। বিষণ্ণতা ও মানসিক চাপ থেকে অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এসব ক্ষেত্রে মানসিক সহায়তা ও সাইকোলজিক্যাল সাপোর্ট খুবই জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপমৃত্যু কোনো একক ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়—এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক সংকটের প্রতিফলন। পারিবারিক যোগাযোগের অভাব, মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা, সামাজিক চাপ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এসব মৃত্যুর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুজ্জামান সরকার বলেন, গত বছরের তুলনায় অপমৃত্যুর সংখ্যা কমেছে, যা আশাব্যঞ্জক। তবে একটি মৃত্যুও কাম্য নয়। কাউন্সেলিং, পারিবারিক সচেতনতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জোরদার করলে এসব ঘটনা আরও কমানো সম্ভব।
খানসামা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল বাছেত সরদার বলেন, ২০২৪ সালে অপমৃত্যু ছিল ৬০টি, ২০২৫ সালে তা কমে ৩০-এ নেমেছে। সামাজিক সচেতনতা বাড়লে আগামীতে আরও কমবে বলে আশা করছি।
পরিবারে পারস্পরিক যোগাযোগ জোরদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহজ প্রাপ্যতা প্রশাসন, সমাজ ও পরিবারের সমন্বিত উদ্যোগ নচেৎ আজ সংখ্যা কমলেও আগামী দিনে আবার বাড়তে পারে মায়ের কান্না আর নিথর দেহের সারি।
কেকে/ এমএস