আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি দলীয় ব্যানারে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ বিকল্প কৌশলে ভোটের মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। দলটির সাবেক একাধিক নেতাকে ভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনি মাঠে দেখা যাচ্ছে।
এদিকে আওয়ামী লীগের নেতাদের নিজেদের দলে টানতে তৎপরতা বাড়িয়েছে জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ থেকে আগতদের সব ধরনের দায়-দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য লতিফুর রহমান প্রকাশ্যে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ থেকে যারা জামায়াতে যোগ দেবেন, তাদের সব দায়-দায়িত্ব আমরা নেবে।’ গত মঙ্গলবার বিকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ফাটাপাড়া মদনমোড় এলাকায় এক উঠান বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। ওই বক্তব্যের ভিডিও সেদিন রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়।
তবে এ বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে লতিফুর রহমান বলেন, ‘আমি শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপির লোকজনকেও জামায়াতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। মূলত ইসলামের পথে আসার আহ্বান জানিয়েছি।’ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেউ জামায়াতে যোগ দিয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, ‘না, নেতা পর্যায়ের কেউ যোগ দেননি।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা এবং সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আওয়ামী লীগের একটি অংশ বিকল্প পথে রাজনৈতিক টিকে থাকার চেষ্টা করছে। কেউ অন্য দলের ছাতার নিচে, আবার কেউ স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিচ্ছেন।
এদিকে তথ্য বলছে—ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাবেক তিন নেতা। তারা জাতীয় পার্টি, জেপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনও করেছিলেন। তারা হচ্ছেন টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) আসনে অ্যাডভোকেট ইলিয়াস হোসেন মনি, টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনে তারেক শামস্ খান হিমু ও ব্যারিস্টার আশরাফুল ইসলাম।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারেক শামস্ খান হিমু কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির সহসভাপতি। ৫ আগস্টের পর আত্মগোপনে থাকলেও পরবর্তী সময়ে তিনি গ্রেপ্তার হন। কারাগার থেকে বের হয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি দল পাল্টে জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর আগে তারেক শামস খান হিমু দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ায় এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তিনি।
স্থানীয়রা বলেন, সরকার পতনের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়েছিলেন। ১৪ জুলাই দেশে ফেরার পর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। প্রায় এক মাস কারাগারে থেকে তিনি জামিনে মুক্ত হন। তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর দল জেপির হয়ে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তারেক শামস খান হিমু বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমার ওপর অনেক অবিচার করেছে। জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি পদ থেকে অপসারণ করে সেখানে সাবেক প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটুকে স্থলাভিষিক্ত করেছিল।’ তবে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কয়েকজন নেতাকর্মী বলেন, তারা হিমুর অপসারণের বিষয়টি কখনো শুনেনি। এমনটি হয়েছে বলেও তারা জানেন না।
একই আসনে ব্যারিস্টার মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী কমিটির সদস্য এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। নির্বাচন আমি আগেই করে ফেলেছি। এখন অনেকটা ফ্রি সময় কাটাচ্ছি। আমি মা-খালা, বোন-ভাবিদের কাছে গিয়েছি। তাদের সমস্যার কথা শুনেছি। তাদের সমস্যা সমাধান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করব। আমি তাদের কাছ থেকেই স্বাক্ষর নিয়েই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘আমার মনোনয়নপত্রের সঙ্গে চার হাজার ৯০১ জনের স্বাক্ষর নিয়ে জমা দিয়েছি। এক শতাংশ ভোটারের মধ্যে ৯০ ভাগই মহিলা। আমি ২০১৮ সালে মনোনয়ন চেয়েছিলাম পাইনি। ২০২৪ সালে মনোনয়ন চাইনি কিন্তু স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছি। এবারও তাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। নারী-পুরুষের ভালোবাসার ভোটই আমাকে বিজয়ী করবে।’
এদিকে টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) আসনে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন। তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত সম্মিলিত আইনজীবী পরিষদের নেতা ছিলেন। ১৩ নভেম্বর জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেন ইলিয়াস। তিনি টাঙ্গাইল জেলা আইনজীবী সমিতিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সম্মিলিত আইনজীবী পরিষদে একবার কার্যকরী সদস্য এবং পরবর্তীতে যুগ্ম সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তিনি ধনবাড়ী উপজেলার নরিল্যা গ্রামের মরহুম তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে।
ইলিয়াস হোসেন মনি বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের সক্রিয় বা পদবিধারী নেতা ছিলাম না। তবে আইনজীবী পরিষদের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি।’
কেকে/এজে